বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

নির্বাচন কমিশনের তালিকায় দুর্গম, গেজেটে নেই হরিরামপুর

নদী-চরবেষ্টিত মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলা। উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের বড় অংশই পদ্মা নদীর চরাঞ্চল ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকা। বর্ষা মৌসুমে এসব এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কোথাও নৌযানই একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম, আবার নদীভাঙন ও বন্যায় অনেক সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে জনপদ।

বিজ্ঞাপন

এমন ভৌগোলিক বাস্তবতায় হরিরামপুরকে দুর্গম এলাকা হিসেবে সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্গম ভাতা দেওয়ার দাবি উঠেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমের আওতায় হরিরামপুরকে দুর্গম এলাকা হিসেবে বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গেজেটভুক্ত দুর্গম এলাকার তালিকায় হরিরামপুরের নাম না থাকায় ক্ষোভ রয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম উপলক্ষে দেশের ২৩ জেলার ৭৫টি উপজেলাকে দুর্গম এলাকা হিসেবে বিবেচনার জন্য নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. নাসির উদ্দিন চৌধুরী (নি:স:-২) স্বাক্ষরিত একটি চিঠি ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল মহাপরিচালক, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ, ঢাকা বরাবর পাঠানো হয়। চিঠির স্মারক নম্বর—১৭.০০.০০০০.০২৬.৩২.০০১.২৫.১৫১।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে দুর্গম এলাকা হিসেবে বিবেচিত হলেও হরিরামপুরকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট গেজেটে দুর্গম উপজেলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে একই ধরনের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্গম ভাতার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সরকারি নথি পর্যালোচনায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানিকগঞ্জের দৌলতপুর ও হরিরামপুরকে গ-শ্রেণির উপজেলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দৌলতপুরকে চর উপজেলা হিসেবে দুর্গম এলাকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হলেও হরিরামপুরকে একইভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়নি। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হরিরামপুরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

তাদের ভাষ্য, দৌলতপুরের মতো হরিরামপুরেরও বড় একটি অংশ চরাঞ্চল। উপজেলার আজিমনগর, লেছরাগঞ্জ ও সুতালড়ি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পদ্মা নদী ও চরাঞ্চলঘেরা। নদীভাঙন, নৌপথনির্ভর যোগাযোগ, বর্ষায় প্লাবন এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এসব এলাকায় সরকারি দায়িত্ব পালন করতে বাড়তি সময়, শ্রম ও ঝুঁকি নিতে হয়।

দুর্গম ভাতার দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন:

দুর্গম এলাকা হিসেবে গেজেটভুক্ত করার দাবিতে গত ২২ সেপ্টেম্বর হরিরামপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাক্ষরিত একটি আবেদন মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া হয়েছে।

আবেদনের অনুলিপি দেওয়া হয়েছে মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য, হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং হরিরামপুর উপজেলা প্রেসক্লাব বরাবর।
আবেদনকারীদের দাবি, ভৌগোলিক অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, নদীভাঙন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় হরিরামপুরকে দুর্গম উপজেলা হিসেবে সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

তাদের দাবি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন-ভাতার পাশাপাশি দুর্গম এলাকার জন্য প্রযোজ্য ২০ শতাংশ ভাতা পাওয়ার সুযোগ চান। তবে এই ভাতা চালুর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সরকারি নীতিমালা ও কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।

শিক্ষা খাতেও দুর্গমতার চিত্র:

হরিরামপুরের চরাঞ্চলে দুর্গমতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থায়।

উপজেলার আজিমনগর, লেছরাগঞ্জ ও সুতালড়ি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা চরাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই তিন ইউনিয়নে মোট ১৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে সুতালড়ি রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বর্তমানে নেই বলে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া এসব বিদ্যালয়ের কয়েকটিতে প্রধান শিক্ষক নেই এবং একাধিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়মিত যাতায়াত ও পদায়ন নিয়েও নানা সমস্যা দেখা দেয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

নদীভাঙনের কারণে বিদ্যালয়ের অবস্থান পরিবর্তন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং বর্ষায় নৌপথের ওপর নির্ভরশীলতা শিক্ষা কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন হারাকান্দি চরাঞ্চলের বাসিন্দারাও।

স্থানীয়দের ভাষ্য, চরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ ও নদীনির্ভর জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। ফলে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি এবং অভিভাবকদের শিক্ষাবিষয়ক সম্পৃক্ততাও অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় থাকে না।

স্বাস্থ্য ও যোগাযোগেও সীমাবদ্ধতা:

হরিরামপুরের চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের অভিযোগ, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। গুরুতর অসুস্থ রোগীকে দ্রুত উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে নৌপথ ও সড়ক যোগাযোগ বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

বর্ষা মৌসুমে নদী ও খালপথে পানি বাড়লে অনেক এলাকায় যাতায়াত আরও কঠিন হয়ে পড়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কাও থাকে।
স্থানীয়দের মতে, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেটসহ আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির সুবিধাও চরাঞ্চলের সব এলাকায় সমানভাবে পৌঁছেনি। ফলে সরকারি তথ্য সংগ্রহ, ভোটার তালিকা হালনাগাদ, বিভিন্ন জরিপ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হয়।

নির্বাচনী দায়িত্বেও বাড়তি ভোগান্তি:

নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন কার্যক্রমে দুর্গম এলাকার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের সময় দুর্গম এলাকায় কর্মরতদের অতিরিক্ত ভাতা দেওয়ার সুযোগ অতীতেও ছিল বলে দাবি তাদের।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য, সমতল এলাকার তুলনায় চরাঞ্চলে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, তথ্য সংগ্রহ ও নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করতে সময় ও শ্রম বেশি লাগে। অনেক ক্ষেত্রে নৌপথে যাতায়াত করতে হয়। তাই দুর্গম এলাকার স্বীকৃতি ও ভাতা দুটোই প্রয়োজন।

এদিকে নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, পার্বত্য অঞ্চল, হাওর অঞ্চল, দ্বীপ অঞ্চল ও সমতল ভূমির দুর্গম এলাকাকে যোগাযোগব্যবস্থা, ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট এবং দুর্গমতার ব্যাপকতা বিবেচনায় ভবিষ্যতে শ্রেণিভিত্তিকভাবে তালিকাভুক্ত করার নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।

বদলি-পদায়নেও অনাগ্রহের অভিযোগ:

হরিরামপুরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ কেউ বলছেন, দুর্গম বা দূরবর্তী এলাকায় পদায়ন হলে অনেকের মধ্যে সেখানে যেতে অনাগ্রহ তৈরি হয়। কেউ বদলির আদেশ পাওয়ার পর নানা কারণে যোগদানে বিলম্ব করেন, আবার কেউ যোগ দিলেও দ্রুত অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক কর্মস্থলে বদলির চেষ্টা করেন—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

তাদের মতে, দুর্গম এলাকায় কর্মরতদের জন্য বাড়তি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এসব এলাকায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের পরিবেশ উন্নত হতে পারে। একই সঙ্গে দুর্গম এলাকায় দায়িত্ব পালনকে শাস্তিমূলক পদায়ন হিসেবে না দেখে বিশেষ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে বদলি বা পদায়ন নিয়ে ব্যক্তিবিশেষের অনাগ্রহের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কেন গেজেটভুক্তি প্রয়োজন:

হরিরামপুরকে দুর্গম উপজেলা হিসেবে গেজেটভুক্ত করার দাবিদারদের যুক্তি, শুধু নদী বা চরাঞ্চল থাকা নয়—একটি এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার বাস্তবতা এবং জনগণের মৌলিক সেবা পাওয়ার সুযোগও দুর্গমতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

তাদের দাবি, হরিরামপুরের দুর্গম চরাঞ্চলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ দুর্গম এলাকার স্বীকৃতি না থাকায় তারা প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এ কারণে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে দুর্গম হিসেবে বিবেচিত হওয়ার বিষয়টি পর্যালোচনা করে হরিরামপুরকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি দিন দিন জোরালো হচ্ছে।

এ বিষয়ে হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার বলেন, চর ভাতার বিষয়ে ডিসি স্যার বরাবর একটা আবেদন দেয়া হয়েছে, এটার বিষয়ে লেখাও হয়েছে। মিনিস্ট্রি থেকে আমরা এখনো কেন ফিডব্যাক পাইনি। ডিসি স্যার ওইটা তাদেরকেও অবহিত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানার বক্তব্যের জন্য মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি, ফোন রিসিভ করেনি।

হরিরামপুরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, প্রশাসনের ইতিবাচক উদ্যোগের মাধ্যমে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে হরিরামপুরকে দুর্গম উপজেলা হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হোক।

তবে শেষ পর্যন্ত হরিরামপুরকে দুর্গম এলাকার সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না এবং দুর্গম ভাতা চালুর বিষয়টি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও সরকারি প্রক্রিয়ার ওপর।

চরাঞ্চলের মানুষের পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যাশা—হরিরামপুরের বাস্তব ভৌগোলিক পরিস্থিতি ও নাগরিক সেবা প্রদানের চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি দ্রুত পর্যালোচনা করা হবে।

পড়ুন : দুই কোটি টাকার সড়কে নিম্নমানের সামগ্রী, এলজিইডিতে ঘুষের অভিযোগ

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন