বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

স্বপ্ন বুনছে ১১২ অনাথ শিশু, তবে নিভু নিভু ‘নয়ন যোগী আশ্রম’-এর প্রদীপ

চোখে মুখে তাদের আগামীর রঙিন স্বপ্ন, অথচ বাস্তবে প্রতিদিন লড়তে হচ্ছে তিনবেলা খাবার আর বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারের জন্য। নেত্রকোনার দুর্গাপুরের সর্ববৃহৎ অনাথালয় ‘নয়ন যোগী আশ্রম মানব কল্যাণকামী অনাথালয়’-এর ১১২ জন শিশুর দিন কাটছে এভাবেই। একসময় যে প্রাঙ্গণ শিশুদের নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের প্রতীক ছিল, আজ তা চরম আর্থিক সংকটে ধুঁকছে। সরকারি বরাদ্দ ও বেসরকারি অনুদান আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় এই সংখ্যক শিশুর খাদ্য, শিক্ষা, বাসস্থান ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে গিয়ে রীতিমতো দিশেহারা আশ্রম কর্তৃপক্ষ।

দুর্গাপুর উপজেলার চণ্ডীগড় ইউনিয়নের চণ্ডীগড় গ্রামে ১৯৯৬ সালে অনাথালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবক নিত্যানন্দ গোস্বামী নয়ন। পরম মমতায় গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সরকারি-বেসরকারি সহায়তা অব্যাহত ছিল। ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠাতা নিত্যানন্দ গোস্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই যেন আশ্রমটিতে আঁধার নামতে শুরু করে। যোগ্য অভিভাবকত্বের অভাবে এবং নানাবিধ কারণে ধীরে ধীরে কমতে থাকে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দাতাদের আর্থিক সহায়তা।

আশ্রমের বর্তমান অচলাবস্থার সবচেয়ে বড় কারণ সরকারি বরাদ্দের অপর্যাপ্ততা। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মাত্র বছর দুয়েক আগেও এখানকার ১১২ জন অনাথ শিশুর মধ্যে ৫৬ জনের বিপরীতে সরকারি বরাদ্দ পাওয়া যেত। অভাবনীয়ভাবে গত বছর সেই বরাদ্দ একলাফে কমিয়ে মাত্র ২২ জনে নামিয়ে আনা হয়। চলতি বছর কিছুটা বাড়িয়ে ৩২ জনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হলেও, তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগণ্য।

বাকি ৮০ জন অনাথ শিশুর ভরণপোষণের জন্য বর্তমানে আশ্রম কর্তৃপক্ষের হাতে কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থায়ন নেই। ফলে বাধ্য হয়েই শিশুদের পুষ্টিকর খাবার, উপযুক্ত শীতের বা গরমের পোশাক, স্বাস্থ্যসেবা এবং পড়াশোনার মতো মৌলিক অধিকারগুলোর সাথে আপস করতে হচ্ছে।

আশ্রমের নিভৃত প্রকোষ্ঠে থাকা শিশুরাও এমন রূঢ় বাস্তবতার সাথে পরিচিত। জীবনের শুরুতেই কঠিন সংগ্রামের মুখোমুখি হওয়া এই শিশুরা জানায়, মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের জন্য প্রতিদিন তাদের নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তবু অভাব আর কষ্টের মাঝেই তারা আগামীর সুন্দর এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে।

আশ্রমটির বর্তমান পরিচালক নিশা দেবী গভীর উদ্বেগের সাথে জানান, “শিশুদের স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের জরুরি সহায়তা এখন সময়ের দাবি। দ্রুত পর্যাপ্ত অনুদান না পেলে অনাথালয়টির প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পুরোপুরি ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা শিশুদের পথে বসিয়ে দিতে পারে।”

শিশুদের অসহায়ত্ব ভাবিয়ে তুলেছে স্থানীয় সচেতন মহলকেও। সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও কবি লোকান্ত শাওন বলেন, “এই শিশুদের মুখে হাসি ধরে রাখা পুরো সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের দ্রুত এগিয়ে আসা জরুরি। সবার সম্মিলিত চেষ্টাতেই কেবল এই অনাথ শিশুদের জন্য নিরাপদ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।”

এ বিষয়ে দুর্গাপুর উপজেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আহমেদ সাদাত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আশ্রম কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়ে আমরা আবেদন পেয়েছি। আবেদনটি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, অনাথ শিশুদের স্বার্থে এ বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”

সমাজের একটু সহানুভূতি আর রাষ্ট্রের সামান্য সুদৃষ্টিই পারে চণ্ডীগড় গ্রামের ১১২টি শিশুর চোখের স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে। নয়ন যোগী আশ্রমের নিভু নিভু প্রদীপটি যেন অর্থের অভাবে নিভে না যায়, সেটাই এখন সচেতন মহলের প্রত্যাশা।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : কলমাকান্দায় সাংবাদিককে ‘দুই পয়সার’ কটাক্ষ, সমবায় ম্যানেজারের ক্ষোভ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন