বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রাস্তায় কাঁটা, আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা: নেত্রকোনায় মাদরাসার পথ অবরুদ্ধ

সবুজ ধানের ক্ষেতের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া সরু একটি আইল, আর সেই পথটিতেই ফেলে রাখা হয়েছে ডালপালা ও কাঁটার স্তূপ। শিশু থেকে শুরু করে নারী শিক্ষার্থীরা বই-খাতা বুকে জড়িয়ে চরম ঝুঁকি নিয়ে সেই পথটুকু পার হওয়ার চেষ্টা করছেন। নেত্রকোনা সদরের পশ্চিম মইনপুর এলাকায় নারী শিক্ষার অন্যতম প্রতিষ্ঠান ‘রাহে জান্নাত কওমী আদর্শ মহিলা মাদ্রাসা’র ছাত্রীদের প্রতিদিনকার চিত্র এখন এমনই। মাদরাসায় যাতায়াতের পথটি আইল কেটে সরু করে সেখানে ধানক্ষেত তৈরি এবং কাঁটার বেড়া দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে। ফলে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের শত শত শিশু ও নারী শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, মাদরাসার শিক্ষক ও ছাত্রীরা দল বেঁধে হেঁটে আসার সময় ধানের জমিতে ফেলে রাখা ডালপালা ও কাঁটার প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছেন এবং বাধ্য হয়ে সেই বাধা ডিঙিয়ে তাদের যাতায়াত করতে হচ্ছে। নিজস্ব জায়গায় প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাটিতে নূরানী কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে মিশকাত পর্যন্ত পাঠদান করা হয় এবং এখানে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ, একটি সুন্দর পরিবেশে গড়ে ওঠা এই দ্বীনী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রম এখন অনেকটাই স্থবির। শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে আতঙ্ক ও ক্ষোভ যাতায়াতের পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।

মাদরাসার পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী সুমা আক্তার, তৃতীয় শ্রেণির রুকাইয়া এবং শিশু শিক্ষার্থী মায়মুনা আক্তার মিম জানায়, তাদের চলাচলের রাস্তায় ইচ্ছাকৃতভাবে কাঁটা ফেলে রাখা হয়। বর্ষাকালে রাস্তাটি কেটে যাতায়াতের সম্পূর্ণ অনুপযোগী করে দেওয়া হয়। তারা আরও জানায়, মাদরাসার ওস্তাদকে (শিক্ষক) পিটিয়ে পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং স্থানীয় নজরুল ও রানা নামের ব্যক্তিরা তাদের নিয়মিত অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও হুমকি দিচ্ছে।

কুদুরী জামাতের শিক্ষার্থী মাহমুদা, আদিবা আক্তার ও প্রীতি আক্তার জানান, এমনিতেই বর্ষাকালে যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়, তার ওপর রাস্তা কেটে ফেলার হুমকিতে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সামনেই সমাপনী পরীক্ষা, দুর্বৃত্তদের ক্রমাগত মাদরাসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিতে ছাত্রীরা ভয়ে মাদরাসায় আসতে পারছে না।

কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়দের ক্ষোভ মাদরাসার শিক্ষক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, রাস্তা বন্ধ থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবারই পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে এবং পড়াশোনার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। তিনি এর স্থায়ী সমাধান দাবি করেন। মাদরাসার পরিচালকের বোন সুফিয়া আক্তার সাথী অভিযোগ করেন, সম্প্রতি ঘন কুয়াশার সুযোগ নিয়ে দুর্বৃত্তরা মাদ্রাসার সীমানা গেট ভেঙে ফেলে এবং আমার ভাইকে মারধর করে আহত করে।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ শাফী ও মাও. দেলোয়ার হোসাইন এ ঘটনাকে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। শাফী বলেন, “এই আইল দিয়ে দুই-চার-পাঁচ এলাকার মেয়েরা এখানে পড়ালেখা করতে আসে। এখন আইল কেটে ধানক্ষেত বানানো হয়েছে এবং লেবু ও বেতের কাঁটা দিয়ে বেষ্টন করে রাখা হয়েছে। একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে এমন আচরণ একদম অনুচিত।” দেলোয়ার হোসাইন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, রাস্তা খুলে দেওয়া না হলে প্রশাসন ও উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করবেন তারা।

মাদরাসার পরিচালক মাওলানা এমদাদুল্লাহ জানান, ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাটি ২০২১ সালে বর্তমান জায়গায় জমি কিনে স্থানান্তর করা হয়। এরপর থেকেই পার্শ্ববর্তী বাড়ির লোকজন অন্যায়ভাবে বাধা দিচ্ছেন। তিনি অভিযোগ করেন, আমেরিকা প্রবাসী রানা এবং স্থানীয় নজরুল প্রভাশালী এক নেতার নাম ভাঙিয়ে এই অপকর্ম করছেন, যা দলের ভাবমূর্তিও নষ্ট করছে।

এ বিষয়ে আমেরিকা প্রবাসী রানা মারধরের কথা অস্বীকার করে বলেন, এমনভাবে একটি গাছ লাগানো হয়েছে, যা বড় হলে অন্যের জায়গায় চলে আসবে।” তবে মাদরাসার হুজুরের প্রসঙ্গে দাম্ভিকতার সুরে তিনি (রানা) বলেন, “আমরা চাইলে তো তাকে প্রতিদিনই পিটাতে পারি।” রানা মূলত একে ‘ভিলেজ পলিটিক্স’ বলে আখ্যা দিয়ে জানান, ঘরের পেছনের জায়গা নিয়ে এই বিরোধ। তারা ১৫-১৬ লাখ টাকায় জায়গাটি কিনতে চাইলেও মাদরাসার কাছে ১৩ লাখ টাকায় বিক্রি করায় এই ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রশাসনের হস্তক্ষেপ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমন অচলাবস্থার বিষয়ে নেত্রকোনা মডেল থানার ওসি আবুল খায়ের জানান, অভিযোগ পেয়ে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তদন্তে উঠে এসেছে, দীর্ঘদিনের জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, মারামারি ও চলমান মামলার জেরেই জেল খেটে আসা নজরুল নামে ব্যক্তি ক্ষোভের বশে নিজের জায়গার ওপর দিয়ে যাওয়া জমির আইলের রাস্তাটি বন্ধ করে দেন।

ওসি বলেন, “যেহেতু এটি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ছাত্রীরা নিয়মিত যাতায়াত করে, তাই পুলিশ তাকে রাস্তাটি খুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এরপরও রাস্তা উন্মুক্ত করা না হলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ব্যক্তিগত বা জমিজমা সংক্রান্ত যেকোনো বিরোধের আইনি সমাধান হতে পারে, কিন্তু তার জেরে নারী শিক্ষার পথ রুদ্ধ করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জিম্মি করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। অবিলম্বে এমন অমানবিক প্রতিবন্ধকতা দূর করে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : ঠাকুরগাঁওয়ে প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগের জার্সির উন্মোচন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন