টেইলর সুইফটের মুকুটে যোগ হলো আরেকটি পালক। এমটিভি ভিডিও মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পুরস্কারজয়ী শিল্পী এখন তিনি। ২৭ সেপ্টেম্বর লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত এবারের আয়োজনে নতুন একটি সম্মাননা পাওয়ার পর সুইফটের পুরস্কারসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১-এ। এর মধ্য দিয়ে ৩০টি পুরস্কার নিয়ে এতদিনের রেকর্ডধারী বিয়ন্সেকে ছাড়িয়ে গেলেন তিনি।
সংগীতের পাশাপাশি মিউজিক ভিডিও নির্মাণ ও দৃশ্যভিত্তিক গল্প বলায় অবদানের জন্য সুইফটকে দেওয়া হয় এই বিশেষ সম্মাননা। পুরস্কার গ্রহণের সময় তিনি সংগীত ভিডিওর জন্য দীর্ঘদিন ধরে মঞ্চ তৈরি করে দেয়ায় আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান। পাশাপাশি নিজের সাফল্যের কৃতিত্ব দিয়েছেন ভক্তদেরও।
অনুষ্ঠানে সুইফটের পরিচালনায় নির্মিত ‘পেশেন্ট জিরো’ গানের মিউজিক ভিডিও প্রথমবার দেখানো হয়। এতে অভিনয় করেছেন সুইফট, ডাকোটা জনসন ও কলিন ফ্যারেল।
এবারের আয়োজনে ‘দ্য ফেট অব অফেলিয়া’ গানের জন্য বর্ষসেরা ভিডিওর পুরস্কারও জিতেছেন সুইফট। প্রায় দুই দশকের ক্যারিয়ারে ৬০টির মতো মিউজিক ভিডিও তৈরি করেছেন তিনি। এর মধ্যে ১৮টি ভিডিও নিজেই লিখেছেন ও পরিচালনা করেছেন।
নতুন এই সম্মাননার মধ্য দিয়ে পুরস্কারের সংখ্যায় তো বটেই, মিউজিক ভিডিও নির্মাণেও নিজের আলাদা অবস্থান আরও শক্ত করলেন টেইলর সুইফট।
সুমিষ্ট কণ্ঠ আর মিষ্টি চেহারার টেইলর সুইফট সারা বিশ্বের সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে অতি পরিচিত এক নাম। সোনালী চুল, গাঢ় নীল চোখ ও পাতলা গড়নের টেইলরকে দেখলে অনেকের কাছেই রূপকথার পরীর কথা মনে হতে পারে। তার গানের কথাতেও যেন থাকে সেই রূপকথার আবেশ—নতুন দিন, নতুন আশা, সম্ভাবনা আর নতুন প্রতিজ্ঞার কথা।
মাত্র ৩৬ বছর বয়সেই টেইলর পেয়েছেন আকাশছোঁয়া খ্যাতি, অঢেল অর্জন ও বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের ভালোবাসা। একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম এই সঙ্গীতজ্ঞের জীবন ও ক্যারিয়ারের নানা জানা-অজানা দিক তুলে ধরা হলো।
টেইলর অ্যালিসন সুইফটের জন্ম ১৯৮৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর পেনসিলভানিয়ার রিডিংয়ে। উয়্যামিসিংয়ের কাছাকাছি পারিবারিক ক্রিসমাস ট্রি ফার্মেই তার শৈশব কাটে। বাবা স্কট কিংসলে সুইফট ও মা আন্দ্রিয়া ফিনলের আদরের মেয়ে টেইলরের ওপর তার অপেরা শিল্পী নানী মেজরি ফিনলেরও যথেষ্ট প্রভাব ছিল।
তবে সঙ্গীতের ক্ষেত্রে টেইলরের অনুপ্রেরণার বড় জায়গাজুড়ে ছিলেন প্যাস্টি ক্লাইন, ডলি পার্টন, লে অ্যান রাইমস, শানিয়া টোয়াইন ও ডিক্সি চিকসের মতো শিল্পীরা। এমনকি ‘টেইলর’ নামটিও রাখা হয় প্রখ্যাত মার্কিন শিল্পী, গীতিকার ও গিটারিস্ট জেমস টেইলরের নাম অনুসারে।
কান্ট্রি মিউজিক দিয়েই টেইলরের সঙ্গীতযাত্রা শুরু। আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে উদ্ভূত এই জনপ্রিয় সঙ্গীতধারায় নৃত্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে লোকগাঁথা বা গল্প তুলে ধরা হয়। এতে বাঁশি, ব্যাঞ্জো, গিটারসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয়।
মাত্র ১০ বছর বয়স থেকেই স্থানীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করতেন টেইলর। লে অ্যান রাইমসের ‘বিগ ডিল’ গেয়ে একটি স্থানীয় প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় জয় পান তিনি। ১২ বছর বয়সে গিটারের ওপর দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি গান লেখাও শুরু করেন। তার প্রথম লেখা গান ছিল ‘লাকি ইউ’।
লেখালেখিতেও ছোটবেলা থেকেই দক্ষতার পরিচয় দেন টেইলর। স্কুলে পড়ার সময় জাতীয় কবিতা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ‘মনস্টার ইন মাই ক্লোজেট’ কবিতার জন্য জাতীয় পুরস্কার পান। একই বয়সে ৩৫০ পৃষ্ঠার একটি উপন্যাসও লিখেছিলেন তিনি, যদিও সেটি প্রকাশ করেননি।
রেকর্ড ভাঙা ও নতুন রেকর্ড গড়ার ধারাও পরবর্তী অ্যালবামগুলোতে অব্যাহত থাকে। ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় টেইলরের চতুর্থ অ্যালবাম ‘Red’। ১৬টি গানের এই অ্যালবামের ৯টি গান ছিল তার নিজের লেখা। ‘We are never ever getting back together’ ও ‘I knew you were trouble’ অ্যালবামটির উল্লেখযোগ্য গান।
‘Red’ অ্যালবামের মাধ্যমে কান্ট্রি মিউজিকের পাশাপাশি ড্যান্স পপ, হার্টল্যান্ড রক ও ডাবস্টেপ ট্র্যাকেও নিজের দক্ষতা তুলে ধরেন টেইলর। এই অ্যালবামের মাধ্যমে প্রথম নারী শিল্পী হিসেবে ২ মিলিয়ন অ্যালবাম বিক্রির গিনেস রেকর্ডেও নাম লেখান তিনি।
২০১৪ সালে আসে ‘1989’, যা টেইলরের জন্মসাল। এই অ্যালবাম প্রকাশের মাধ্যমে প্রথম নারী শিল্পী হিসেবে পরপর তিনটি অ্যালবামের এক মিলিয়নের বেশি কপি বিক্রির রেকর্ড গড়েন তিনি।
টেইলরের ষষ্ঠ অ্যালবাম ‘Reputation’ প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালের নভেম্বরে। ‘Look what you made me do’, ‘I did something bad’ ও ‘Don’t blame me’ অ্যালবামটির উল্লেখযোগ্য গান। এড শিরানের সঙ্গে গাওয়া ‘End Game’ও ছিল অ্যালবামটির অন্যতম আকর্ষণ।
গানের পাশাপাশি অভিনয়েও নিজের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন টেইলর। ২০০৯ সালে ‘হানা মনটানা’ সিনেমায় অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। পরের বছর ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ সিনেমায় জেসিকা অ্যালবা, অ্যানি হ্যাথওয়ে ও ব্র্যাডলি কুপারের সঙ্গে অভিনয় করেন টেইলর।
তার অভিনয় প্রতিভার প্রকাশ ঘটেছে নিজের বিভিন্ন মিউজিক ভিডিওতেও। ‘Love Story’-তে সোনালী চুলের রাজকুমারী, ‘Crazier’-এ গিটার হাতে স্টেজ শিল্পী, ‘You belong with me’-তে চশমা পরা মেয়ে কিংবা ‘Bad Blood’-এ দুরন্ত অবতারে দেখা গেছে তাকে। ‘Look what you made me do’ গানের ভিডিওতে একইসঙ্গে বিভিন্ন রূপে হাজির হয়েছেন টেইলর। এর মধ্যে জোম্বি রূপও ছিল।
সঙ্গীতজীবনে টেইলরের অর্জনের তালিকাও দীর্ঘ। তার ঝুলিতে রয়েছে ১০টি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড, ২৩টি বিলবোর্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ড, ১১টি কান্ট্রি মিউজিক অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড, ৮টি একাডেমি অব কান্ট্রি মিউজিক অ্যাওয়ার্ড, ১৯টি আমেরিকান মিউজিক অ্যাওয়ার্ড, ১টি ব্রিট অ্যাওয়ার্ড ও ১টি এমি অ্যাওয়ার্ডসহ আরও অনেক পুরস্কার ও মনোনয়ন।
ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে গ্র্যামি জয়ী শিল্পীও টেইলর সুইফট। ২০১০ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে এই অর্জন করেন তিনি। অসাধারণ গীতিকার হিসেবে ‘দ্য সংরাইটার্স হল অব ফেম’-এও জায়গা করে নিয়েছেন টেইলর।
সময় গড়ানোর সঙ্গে নিজেকে নতুনভাবে তুলে ধরছেন টেইলর সুইফট। প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করছেন তিনি। নতুন বছরে ভক্তদের জন্য কী চমক নিয়ে আসেন টেইলর, এখন সেই অপেক্ষাই। ততদিন তার সর্বশেষ অ্যালবামের সুরেই মেতে থাকুক ভক্তরা।
পড়ুন : সত্যজিৎ রায়ের গল্পে নতুন চরিত্রে সব্যসাচী
সা/


