বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিশ্ব হার্ট দিবস: হৃদ্‌রোগের সতর্ক সংকেত চিনুন

২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস। ২০২৬ সালের প্রচারাভিযানের মূল আহ্বান—“Don’t Miss a Beat- Heart Disease Can Hide in Plain Sight”—অর্থাৎ আপাত সুস্থতার আড়ালেও হৃদ্‌রোগ লুকিয়ে থাকতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ব হার্ট ফেডারেশন সতর্ক সংকেত চেনা, হৃদ্‌স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখা এবং কার্যকর উদ্যোগের দাবি জানানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। আমাদের জীবনে এই আহ্বানের মর্মার্থ হোক—সংকেত চিনুন, ঝুঁকি জানুন, সময়মতো পদক্ষেপ নিন।

হৃদ্‌রোগ সব সময় জোরালোভাবে নিজের উপস্থিতি জানান দেয় না। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস কিংবা ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের বৃদ্ধি দীর্ঘদিন অজানা থাকতে পারে। নিয়মিত কাজ করা, হাঁটাচলা করা কিংবা বাইরে থেকে সুস্থ দেখালেই ঝুঁকিমুক্ত থাকা নিশ্চিত হয় না। তাই নিজের রক্তচাপ জানা, প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা এবং বয়স ও পারিবারিক ইতিহাস বিবেচনায় ঝুঁকি মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ।

হৃদ্‌রোগের সতর্ক সংকেতও সবার ক্ষেত্রে এক রকম নয়। বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী অনুভূতি বা অস্বস্তি, বাহু, পিঠ কিংবা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম বা বমিভাব হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে তীব্র বুকব্যথা নাও থাকতে পারে। তাই সন্দেহজনক উপসর্গকে ‘গ্যাস’ ধরে অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রয়োজন। নিজের অনুমান দিয়ে বিপদ বাতিল করা নিরাপদ নয়।

কেন সময় এত গুরুত্বপূর্ণ

হৃদ্‌পিণ্ড সারা শরীরে রক্ত পাঠালেও তার নিজের পেশির জন্যও নিরবচ্ছিন্ন রক্ত ও অক্সিজেন প্রয়োজন। এই সরবরাহ আসে করোনারি ধমনির মাধ্যমে। অনেক হার্ট অ্যাটাকে ধমনির ভেতরের প্ল্যাক ফেটে বা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে রক্ত জমাট বাঁধে। রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে হৃদ্‌পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে।

বিলম্ব হলে ক্ষতি বাড়তে পারে। কমে যেতে পারে হৃদ্‌যন্ত্রের পাম্প করার ক্ষমতা, দেখা দিতে পারে বিপজ্জনক অনিয়মিত হৃদ্‌স্পন্দন কিংবা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। এ কারণেই বলা হয়, “Time is muscle”—সময় হারানোর সঙ্গে কার্যকর হৃদ্‌পেশিও হারিয়ে যেতে পারে।

প্রাইমারি পিসিআই হলো আগে জমাট গলানোর ওষুধ প্রয়োগ না করে জরুরি ক্যাথেটারভিত্তিক পদ্ধতিতে আক্রান্ত ধমনিতে রক্তপ্রবাহ ফিরিয়ে দেওয়ার চিকিৎসা। সাধারণত কবজি বা কুঁচকির ধমনি দিয়ে সরু নল প্রবেশ করিয়ে বাধার স্থান শনাক্ত করা হয়। এরপর বেলুন ও প্রয়োজনমতো স্টেন্ট ব্যবহার করা হয়। সাধারণ মানুষের কাছে এটি ‘হার্টে রিং পরানো’ নামে পরিচিত। তবে জরুরি হার্ট অ্যাটাকে এর তাৎপর্য আরও গভীর—রক্ত ও অক্সিজেনের অভাবে বিপন্ন হৃদ্‌পেশিকে রক্ষার সুযোগ তৈরি করা।

এই চিকিৎসার ভিত্তি আন্তর্জাতিক প্রমাণ ও নির্দেশিকা। বর্তমানে প্রাসঙ্গিক সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ মার্কিন অ্যাকিউট করোনারি সিনড্রোম নির্দেশিকা প্রকাশিত হয়েছে ২০২৫ সালে। ইউরোপীয় সোসাইটি অব কার্ডিওলজির পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকাটি ২০২৩ সালের। উভয় নির্দেশিকাই উপযুক্ত রোগীর দ্রুত মূল্যায়ন, সময়মতো রক্তপ্রবাহ পুনঃস্থাপন এবং পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি সেবাকে গুরুত্ব দেয়।

সময়সীমার মধ্যে দক্ষ ও প্রস্তুত দলের মাধ্যমে করা সম্ভব হলে এসটি-এলিভেশন মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন বা এসটিইএমআই ধরনের হার্ট অ্যাটাকে প্রাইমারি পিসিআই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত চিকিৎসা। ২০২৫ সালের মার্কিন নির্দেশিকায় উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে প্রথম চিকিৎসাসংযোগ থেকে পিসিআইয়ের প্রথম যন্ত্র প্রয়োগের লক্ষ্য সরাসরি পিসিআই-সক্ষম কেন্দ্রে আসার ক্ষেত্রে ৯০ মিনিটের মধ্যে এবং অন্য হাসপাতাল থেকে স্থানান্তর প্রয়োজন হলে ১২০ মিনিটের মধ্যে রাখা হয়েছে। এই সময়সীমা স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতির মানদণ্ড; অপেক্ষা করার সময় নয়।

ইউরোপীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী, এসটিইএমআই নির্ণয়ের পর ১২০ মিনিটের মধ্যে পিসিআইয়ের মাধ্যমে রক্তপ্রবাহ পুনঃস্থাপন সম্ভব না হলে উপসর্গ শুরুর ১২ ঘণ্টার মধ্যে আসা উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা যাচাই করে দ্রুত জমাট গলানোর ওষুধ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়। এরপর পিসিআই কেন্দ্রে স্থানান্তর প্রয়োজন। ওষুধে রক্তপ্রবাহ না ফিরলে জরুরি রেসকিউ পিসিআই করতে হয়। অর্থাৎ একটি চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে গিয়ে উপযুক্ত বিকল্প চিকিৎসার সুযোগ হারানোও কাম্য নয়।

চার ঘণ্টা কোনো চূড়ান্ত সীমারেখা নয়

একটি প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা জরুরি—হার্ট অ্যাটাকের চার ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে চিকিৎসার আর সুযোগ থাকে না, এমনটি সঠিক নয়। প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত মূল্যবান হলেও চার ঘণ্টা কোনো চূড়ান্ত সীমারেখা নয়।

চলমান রক্তস্বল্পতা, শক বা গুরুতর অস্থিতিশীলতা থাকলে আরও পরেও জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। দেরি হয়ে গেছে ভেবে চিকিৎসা নেওয়া থেকে বিরত থাকা বিপজ্জনক।

আধুনিক নির্দেশিকা চিকিৎসাকে আরও নিরাপদ ও নির্ভুল করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে। ২০২৫ সালের মার্কিন নির্দেশিকায় পিসিআইয়ের জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্রে কবজির ধমনি ব্যবহারের অগ্রাধিকার রয়েছে, যা রক্তপাত ও রক্তনালির জটিলতা কমাতে সাহায্য করে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ধমনির ভেতরের ছবি দেখে পিসিআই পরিচালনার প্রযুক্তিও গুরুত্ব পেয়েছে। এসব অগ্রগতির লক্ষ্য রোগীর ফলাফল উন্নত করা; কোন পদ্ধতি প্রয়োজন, তা তাঁর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসা দল নির্ধারণ করবে।

বিদেশে চিকিৎসার আগে জরুরিতার বিষয়টি বুঝতে হবে

বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে জরুরিতার বাস্তবতায় বিচার করতে হবে। পরিকল্পিত চিকিৎসায় পছন্দের কেন্দ্র বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু তীব্র হার্ট অ্যাটাকে যাত্রার প্রস্তুতি ও দীর্ঘ স্থানান্তরের বিলম্ব বিপজ্জনক হতে পারে।

কাছেই উপযুক্ত জরুরি চিকিৎসা পাওয়া গেলে সেটি পিছিয়ে দেওয়ার সম্ভাব্য পরিণতি রোগী ও পরিবারকে স্পষ্টভাবে বোঝানো দরকার। স্থানান্তর প্রয়োজন হলে তা হবে চিকিৎসা দলের পরামর্শে এবং গ্রহণকারী কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করে।

এই আলোচনা হতে হবে সহমর্মিতার সঙ্গে। সংকটের মুহূর্তে রোগী ও পরিবার ভয় পান, প্রশ্ন করেন এবং পরিচিতজনের পরামর্শ খোঁজেন। তাঁদের দ্বিধাকে অবজ্ঞা করলে আস্থা তৈরি হয় না। সহজ ভাষায় বলতে হবে—কী হয়েছে, এখন কী করা প্রয়োজন, চিকিৎসার ঝুঁকি কী এবং অপেক্ষা করলে কী হতে পারে। রোগীর অবহিত সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়ে তাঁর উদ্বেগ কমানোও চিকিৎসার অংশ।

তবে দ্রুত সিদ্ধান্তের দায়িত্ব শুধু রোগী ও পরিবারের ওপর চাপানো যাবে না। সম্মতি দেওয়ার পরও যদি প্রস্তুত দল পাওয়া না যায়, অ্যাম্বুলেন্স না মেলে কিংবা এক হাসপাতাল থেকে অন্যটিতে ঘুরতে হয়, তাহলে সচেতনতার সুফল সীমিত হয়ে পড়ে। প্রয়োজন দ্রুত ইসিজি, কার্যকর জরুরি বিভাগ, সার্বক্ষণিক প্রস্তুত চিকিৎসাকেন্দ্র এবং সমন্বিত রেফারেলব্যবস্থা।

বাংলাদেশে আঞ্চলিক কেন্দ্রভিত্তিক জাতীয় জরুরি হৃদ্‌রোগসেবা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যেতে পারে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলো সক্ষম কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। দূর থেকে ইসিজি দেখে পরামর্শ, রোগী পাঠানোর আগে যোগাযোগ এবং কোথায় কোন সেবা চালু আছে তার হালনাগাদ তথ্য—এসব ব্যবস্থা বিলম্ব কমাতে সাহায্য করতে পারে।

জরুরি চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে যেন দরিদ্র পরিবারের মূল্যবান সময় হারিয়ে না যায়, সে জন্য আর্থিক সুরক্ষাও প্রয়োজন।

হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরাই চিকিৎসার শেষ নয়

থেকে বাড়ি ফেরাই চিকিৎসার শেষ ধাপ নয়। নির্ধারিত অ্যান্টিপ্লেটলেট ওষুধ, কোলেস্টেরল কমানোর চিকিৎসা, ঝুঁকির নিয়ন্ত্রণ এবং কার্ডিয়াক পুনর্বাসন পরবর্তী সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ওষুধের ধরন ও মেয়াদ রোগীর রক্তপাতসহ অন্যান্য ঝুঁকি বিবেচনায় নির্ধারিত হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। আধুনিক নির্দেশিকার লক্ষ্য মানুষকে শুধু তাৎক্ষণিক বিপদ থেকে ফিরিয়ে আনা নয়, জানবেন, সতর্কসংকেত চিনবেন এবং দ্রুত সাহায্য চাইবেন। স্বাস্থ্যব্যবস্থা সেই আহ্বানে সময়মতো সাড়া দেবে। চিকিৎসার মান, স্বচ্ছ পরবর্তী অসুস্থতার ঝুঁকিও কমানো।

বিশ্ব হার্ট দিবসের অঙ্গীকার তাই একটি দিনের আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। মানুষ নিজের ঝুঁকি জানবেন, সতর্কসংকেত চিনবেন এবং দ্রুত সাহায্য চাইবেন। স্বাস্থ্যব্যবস্থা সেই আহ্বানে সময়মতো সাড়া দেবে। চিকিৎসার মান, স্বচ্ছতা, সহমর্মিতা এবং আর্থিক সুরক্ষা একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।

ক্যাথল্যাবে একটি ধমনিতে রক্তপ্রবাহ ফিরে এলে চিকিৎসক চিকিৎসার অগ্রগতি দেখতে পান। বাইরে অপেক্ষমাণ পরিবার সেই অগ্রগতির মধ্যে দেখে আরও কিছু সম্ভাবনা—বাবার সঙ্গে আবার কথা বলা, মায়ের পাশে বসে খাওয়া, জীবনসঙ্গীর হাত ধরে ঘরে ফেরা।

প্রতিটি রোগীর পেছনে এমন একটি পৃথিবী থাকে। থাকে অপেক্ষমাণ মানুষ, অসমাপ্ত দায়িত্ব এবং আগামী দিনের ছোট ছোট স্বপ্ন। সময়মতো চিকিৎসা সেই পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখার সুযোগ বাড়ায়।

তাই সংকেত চিনুন, ঝুঁকি জানুন, সময়মতো পদক্ষেপ নিন। হার্ট অ্যাটাকে প্রতিটি মিনিট মূল্যবান। সময় বাঁচান, জীবন বাঁচান—যেন আরও একটি পরিবারের দরজায় প্রিয় মানুষটির ফিরে আসার শব্দ শোনা যায়।

বিশ্ব হার্ট দিবসের মূল লক্ষ্য ও গুরুত্ব

সচেতনতা বৃদ্ধি: হৃদরোগ এবং কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি ও প্রতিরোধ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা।

লক্ষণ চেনা: হৃদরোগের নীরব বা লুকানো লক্ষণগুলো চেনার ওপর জোর দেওয়া, যাতে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া যায়।

জীবনযাত্রার পরিবর্তন: সুস্থ জীবনযাপনের মাধ্যমে হৃদ্‌পিণ্ডকে সচল ও সবল রাখা।

হৃদ্‌যন্ত্র সুস্থ রাখার উপায়

সুষম খাদ্য গ্রহণ: খাবারে শাকসবজি, ফলমূল, ওমেগা-থ্রি ফ্যাট এবং আঁশযুক্ত খাবার রাখা।

নিয়মিত ব্যায়াম: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট শারীরিক পরিশ্রম বা হাঁটাচলা করা।

ধূমপান বর্জন: ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য পুরোপুরি পরিহার করা এবং মদ্যপান সীমিত রাখা।

ওজন ও চাপ নিয়ন্ত্রণ: মানসিক চাপ কমাতে বিশ্রাম নেওয়া এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা—রক্তচাপ, সুগার ও কোলেস্টেরল মাপা।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন