বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

লক্ষ্মীগঞ্জে ট্যাগ কর্মকর্তা ছাড়াই টিসিবির পণ্য বিতরণ: কে নিচ্ছেন কার দায়?

নেত্রকোনা সদর উপজেলার ৩নং লক্ষ্মীগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিসিবির পণ্য সংগ্রহ করছেন সাধারণ মানুষ, যাদের মধ্যে নারী ও বয়স্কদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও, এই কার্যক্রম চলছে সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই। মাসের পর মাস কোনো ট্যাগ কর্মকর্তার উপস্থিতি ছাড়াই ডিলারদের মাধ্যমে পণ্য বিতরণ করা হচ্ছে। এমন প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বললে তাদের বক্তব্যে উঠে আসে একে অপরের ওপর দায় চাপানোর চিত্র।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সরেজমিনে ইউপি পরিষদ কার্যালয়ে গেলে ট্যাগ কর্মকর্তার উপস্থিতি ছাড়াই ডিলারদের মাধ্যমে পণ্য বিতরণ ও পরবর্তীতে একে অপরের ওপর দায় চাপানোর চিত্র প্রতিবেদকের সামনে উঠে এসেছে।

ট্যাগ কর্মকর্তার অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে টিসিবির ডিলার রাজন জানান, পণ্য বিতরণের সময় তারা ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্তদের, বিশেষ করে সচিব ও মেম্বারদের জানিয়ে থাকেন। তবে সরকার থেকে নিযুক্ত কোনো ট্যাগ কর্মকর্তার উপস্থিতির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান যে তিনি নতুন ডিলার হওয়ায় তাদের ট্যাগ কর্মকর্তা কে, তা তার জানা নেই।

অপর একজন টিসিবি ডিলার আসিফ আহমেদ জানান, বর্তমানে ডিসি অফিস থেকে সরাসরি তাদের নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “‍আমাদের কয়টা মাল আছে না আছে, ওরাই সবকিছু অ্যাপসের মাধ্যমে তদারকি করে।

লক্ষ্মীগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক রুহুল আমিন মানিকের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ট্যাগ কর্মকর্তার দীর্ঘ অনুপস্থিতির বিষয়টি স্বীকার করে নেন। তিনি জানান, “পণ্য বিতরণের সময় আমরা ফিজিক্যালি কোনো ট্যাগ কর্মকর্তাকে পাচ্ছি না।” ট্যাগ কর্মকর্তা না থাকার পরও কীভাবে কার্যক্রম চলছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এই দায়িত্ব তো আমার না, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) স্যার ট্যাগ কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে থাকেন এবং যিনি দায়িত্বে থাকবেন পণ্য বিতরণের সময় ডিলার তাকেই জানাতে হবে।”

লক্ষ্মীগঞ্জ ইউনিয়নে টিসিবির পণ্য বিতরণে ট্যাগ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন নেত্রকোনা সদর উপজেলার ভেটেরিনারি সার্জন ডা. সাদ আস সাদিক। পণ্য বিতরণের সময় তার অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, তিনি বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণে সাভারে অবস্থান করছেন। ডা. সাদ বলেন, “আমি চার মাসের জন্য সাভারে ট্রেনিংয়ে আছি এবং আমার ট্রেনিংয়ের তিন মাস অতিবাহিত হয়ে গেছে। যেহেতু আমি অফিসে নেই, তাই আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা অফিস প্রধান হিসেবে যিনি আছেন, তিনি এই দায়িত্বটি অন্য কাউকে বুঝিয়ে দেবেন।”

অন্যদিকে, ডা. সাদ আস সাদিকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নেত্রকোনা সদর উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আরিফা পারভীন রিপা এই দায় নিতে নারাজ। বিস্তারিত বর্ণনায় তিনি বলেন, “ট্যাগ কর্মকর্তা হিসেবে কাউকে নিয়োগ দেওয়ার এখতিয়ার আমার নেই, এটি উপজেলা প্রশাসনের কাজ। ডা. সাদ প্রশিক্ষণে যাওয়ার সময় আমি তাকে বলেছিলাম ইউএনও মহোদয়ের সাথে দেখা করে বিষয়টি জানাতে। আমি ভেবেছিলাম সে হয়তো যাওয়ার আগে ইউএনও স্যারকে বলে গেছে। তাছাড়া আমার অফিস থেকে কাউকে সাবস্টিটিউট হিসেবে দেওয়ার বিষয়ে আমাকে কেউ ফোন দিয়ে জানায়নি।” বর্তমানে সেখানে কোনো ট্যাগ কর্মকর্তা নেই এবং ডিলাররাও জানেন না তাদের ট্যাগ কর্মকর্তা কে প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নে তিনি (ডা. আরিফা) জানান, ইউএনও সাহেবের সাথে কথা বলে অন্য কাউকে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন বলে আশ্বাস দেন।

নেত্রকোনা সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মনিজা খাতুন জানান, “এখানে নতুন এসেছি। আজ একমাস পূর্ণ হলো মাত্র। তবে ট্যাগ কর্মকর্তার বিষয়ে কেউ আমাকে এখানো অবগত করেনি এবং বিষয়টি আজই শুনলাম।” তিনি গুরুত্বের সাথে বিষয়টি বিবেচনা নিয়েছেন এবং পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশ্বস্থ করেন।

প্রশাসনের এমন সমন্বয়হীনতার বিষয়টি নিয়ে নেত্রকোনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ওয়াহিদ্দুজামানের সাথে কথা বললে তিনি জানান, ট্যাগ কর্মকর্তা নিয়োগ বা পরিবর্তনের বিষয়টি ইউএনও ভালো বলতে পারবেন। তবে ট্যাগ কর্মকর্তা ছাড়া এভাবে পণ্য বিতরণের ঘটনাকে তিনি “খুবই অন্যায় হচ্ছে” বলে মন্তব্য করেন।

পরবর্তীতে নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমানের নজরে পুরো বিষয়টি আনা হলে তিনিও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “কেউ প্রশিক্ষণে গেলে সেটি অবশ্যই রেকর্ড থাকার কথা এবং তার পরিবর্তে অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা। ট্যাগ কর্মকর্তা ছাড়া পণ্য বিতরণ করাটা খুবই অন্যায় হচ্ছে। আমি এখনই বিষয়টি খোঁজ নিচ্ছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।”

সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর একে অপরের ওপর দায় চাপানোর প্রবণতায় সরকারি সেবার মান ও স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। জেলা প্রশাসকের তাৎক্ষণিক আশ্বাসের পর এখন দেখার বিষয়, এমন প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার অবসান ঘটে লক্ষ্মীগঞ্জ ইউপিতে টিসিবির পণ্য বিতরণ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ফিরে আসে কি-না।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : ময়মনসিংহে নাগরিকদের মুখোমুখি সিটি প্রশাসক : আধুনিক নগর গড়ার প্রতিশ্রুতি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন