রপ্তানিমুখী পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে একাধিক শর্ত শিথিল করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে নিট কাপড় বা নিট ফেব্রিক আমদানির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে দেশের নিটওয়্যার রপ্তানিকারকরা আগের মতো বিদেশ থেকে নিট ফেব্রিক আমদানি করতে পারবেন।
বুধবার ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২৯’-এ সংশোধনী এনে এসব পরিবর্তন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সংশোধনের ফলে রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন ও রপ্তানি প্রক্রিয়া আরও সহজ হবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
এর আগে চলতি বছরের ২৫ আগস্ট সরকার ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২৯’ জারি করে। নতুন নীতিতে আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা, ব্যাংকিং জটিলতা কমানো, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে নীতি ঘোষণার পর পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের ব্যবসায়ীরা কিছু বিধান নিয়ে আপত্তি জানান।
মূল আমদানি নীতি আদেশের ২৫ অনুচ্ছেদের ১২ উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, ‘নিট ফেব্রিক আমদানি যোগ্য হবে না।’ অর্থাৎ রপ্তানিমুখী নিট পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট শর্তের বাইরে বিদেশ থেকে নিট ফেব্রিক আমদানি করতে পারত না।
পোশাকশিল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখার স্বার্থে ওই বিধান প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছিল বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)। এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছেও চিঠি দিয়েছিল বিজিএমইএ।
নতুন সংশোধনীতে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী নিট ফেব্রিক আমদানি করে রপ্তানিমুখী পোশাক উৎপাদনে ব্যবহার করতে পারবেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।
নিট ফেব্রিক আমদানির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পাশাপাশি পোশাকশিল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের কাপড় আমদানির শর্তও শিথিল করা হয়েছে।
আগের বিধান অনুযায়ী, গ্রে কাপড় ছাড়া অন্যান্য কাপড় কেবল ১৮ দশমিক ২৯ মিটার বা তার বেশি দৈর্ঘ্যের থানে আমদানি করা যেত। ফলে কাটা বা টুকরো কাপড় আমদানির সুযোগ ছিল না। নতুন সংশোধনীতে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে এ সীমাবদ্ধতা তুলে দেওয়া হয়েছে।
সংশোধিত আদেশ অনুযায়ী, কৃত্রিম তন্তুর তৈরি সীমলেস স্পোর্টসওয়্যার, উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্য এবং ফাংশনাল পোশাক তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাপড় এখন আকৃতি ও আকার নির্বিশেষে আমদানি করা যাবে। তবে এসব কাপড় আমদানির ক্ষেত্রে বিজিএমইএ অথবা বিকেএমইএর সুপারিশ প্রয়োজন হবে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিশেষ ধরনের পোশাক উৎপাদনে নির্দিষ্ট মাপ ও বৈশিষ্ট্যের কাপড়ের প্রয়োজন হয়। এসব পণ্য তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রয়োজনীয় কাপড় সংগ্রহের সুযোগ থাকলে রপ্তানিকারকদের উৎপাদন পরিকল্পনা আরও নমনীয় হবে।
পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের জন্য বিনামূল্যে আমদানির বা এফওসি (ফ্রি অব কস্ট) তালিকাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগের তালিকায় কটন, ম্যান-মেড ফাইবার এবং সিনথেটিক ফেব্রিক্সের মতো উপকরণ থাকলেও এখন এর সঙ্গে ‘অন্যান্য উপকরণ’ যুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিশেষায়িত টেক্সটাইল ও হোসিয়ারি পণ্যের কাঁচামালের পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন এসব কাঁচামালের পরিমাণ ইউডি (ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন) বা ইউপি (ইউটিলাইজেশন পারমিশন) অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে।
এর ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় কাঁচামালের পরিমাণ নির্ধারণ এবং আমদানির ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রক্রিয়াটি আরও স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নতুন সংশোধনীতে হোসিয়ারি ও নিটেড পোশাক খাতের জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন এ ধরনের পোশাক উৎপাদনের জন্য সুতা ও নিটেড কাপড় আমদানির ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতির শর্ত থাকছে না।
আগের ব্যবস্থায় এসব কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হতো। নতুন বিধানের ফলে সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকদের আমদানি প্রক্রিয়া আরও দ্রুত সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হবে।
রপ্তানিমুখী পোশাক খাতের জন্য কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে সময় ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে রপ্তানিকারকদের ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। এ কারণে কাঁচামাল আমদানির বিধি সহজ করার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই শিল্পমালিকদের দাবির মধ্যে ছিল।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাত দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের দাম, সরবরাহব্যবস্থা এবং দ্রুত পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা রপ্তানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় কাঁচামাল আমদানির নিয়ম সহজ করা হলে শিল্পের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা নমনীয়তা আসতে পারে।
সরকারের নতুন আমদানি নীতির মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য প্রক্রিয়া আধুনিকীকরণ, আমদানি ব্যবস্থাপনায় জটিলতা কমানো, ব্যাংকিং ও এলসি-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা। একই সঙ্গে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়টিও নীতিতে গুরুত্ব পেয়েছে।
এর আগে ২৫ আগস্ট জারি করা আমদানি নীতি আদেশে ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে বিভিন্ন কড়াকড়ি শিথিল এবং আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এবার পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের কাঁচামাল আমদানিতে আরও কয়েকটি বিধান সংশোধন করা হলো।
নতুন সংশোধনীর ফলে নিট ফেব্রিক আমদানির সুযোগ পুনর্বহাল, নির্দিষ্ট ধরনের কাটা কাপড় আমদানিতে শর্ত শিথিল, এফওসি আমদানির তালিকা সম্প্রসারণ এবং সুতা ও নিটেড কাপড় আমদানিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতির বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হয়েছে। এসব পরিবর্তন বাস্তবায়নের মাধ্যমে রপ্তানিমুখী পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহ প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পড়ুন:প্লাগ অ্যান্ড প্লের সঙ্গে আলোচনা: ‘৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ সম্ভাবনা’
ইমি/


