পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তদন্তকারী সংস্থার অনুসন্ধানে দেশটিতে সিকদার গ্রুপের প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার বা ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান মিলেছে। এসব সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনতে এবার চূড়ান্ত আইনি লড়াইয়ে নামছে সরকার।
দেশের ব্যাংক খাতের আলোচিত ঋণ কেলেঙ্কারির অন্যতম নাম সিকদার গ্রুপ। ন্যাশনাল ব্যাংকসহ দেশের অন্তত দুই হালি ব্যাংক থেকে ঋণের নামে আমানতকারীদের অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে গ্রুপটির বিরুদ্ধে। অর্থ পাচারের শীর্ষ ১১ শিল্প গ্রুপের তালিকাতেও রয়েছে সিকদার গ্রুপ।
এসব অর্থ উদ্ধারে দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে সিভিল মামলা করার প্রস্তুতি চলছে। এ উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কাজ করছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আইনি প্রতিষ্ঠান আর-ওয়ান। সব প্রস্তুতি শেষে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা অক্টোবরেই বাংলাদেশে আসছেন। ন্যাশনাল ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, আইএফআইসি এবং সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে এ বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ১১টি বড় শিল্প গ্রুপের মধ্যে একটি গ্রুপের অর্থ আদায়ের বিষয়ে বড় অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিএফআইইউ এবং অর্থ উদ্ধারে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানটির যৌথ উদ্যোগেই এই সাফল্যের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, পুরো উদ্যোগটি হবে ‘নো উইন, নো পে’ ভিত্তিতে। অর্থাৎ অর্থ উদ্ধার না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে মামলার খরচ দিতে হবে না।
বিশ্লেষক মামুনুর রশিদ বলেন, রিকভারি এজেন্টরা অর্থ উদ্ধারের পর লেন্ডারদের অর্থ ফেরত দেবে। একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকার উদ্ধার হওয়া অর্থের একটি অংশ রিকভারি এজেন্টকে দেবে এবং রিকভারি এজেন্ট সেই অর্থ লেন্ডারদের ফেরত দেবে।
পাচার হওয়া অর্থ আর কখনো ফেরত আনা যাবে না—এমন হতাশা অনেকের মধ্যে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। তিনি বলেন, একটি উদাহরণ তৈরি করা গেলে তা অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে এবং যারা অর্থ পাচার করেছে, তাদের নিরুৎসাহিত করবে। এ বিষয়ে ইতিবাচক ফল পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী বাংলাদেশ ব্যাংক।
লুট হওয়া আমানতের কতটা ফেরানো সম্ভব হবে, তা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে শুরু হতে যাওয়া এই আইনি লড়াইয়ের ফলের ওপর।
সিকদার গ্রুপের ঋণের পরিমাণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সিকদার গ্রুপের ১৪টি কোম্পানির ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। এর বাইরে সিকদার গ্রুপের পরিচালক রন হক সিকদারের নামে ছিল ৬৮১ কোটি টাকার ঋণ এবং রিক হক সিকদারের নামে ছিল ১৯৩ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে গ্রুপটির ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।
এই ঋণের মধ্যে ৫ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকাই ফান্ডেড বা মেয়াদি ঋণ। বাকি ৪৯৫ কোটি টাকা নন-ফান্ডেড। গ্রুপের এক ডজনের বেশি কোম্পানির নামে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে এসব ঋণ নেয়া হয়েছে।
সিকদার পরিবারের সবচেয়ে বড় ব্যবসা বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে। এ খাতের বিভিন্ন কোম্পানির নামেই ঋণের বড় অংশ রয়েছে। পাওয়ার প্যাক মতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেডের নামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ২২১ কোটি টাকা।
এছাড়া পাওয়ার প্যাক মতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেডের নামে ১ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা, মাল্টিপ্লেক্স হোল্ডিংস লিমিটেডের নামে ২১০ কোটি, পাওয়ার প্যাকের নামে ১২ কোটি, পাওয়ার প্যাক হোল্ডিংস লিমিটেডের নামে ৪৫ কোটি এবং পাওয়ার প্যাক মতিয়ারা খুলনা পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেডের নামে ২৭ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে।
সিকদার গ্রুপের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও রয়েছে বড় অঙ্কের ঋণ। আর অ্যান্ড আর এভিয়েশন লিমিটেডের নামে ৪৬ কোটি, সিকদার রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের নামে ৬৯৫ কোটি, জেড এইচ সিকদার উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হসপিটালের নামে ৮ কোটি, জয়নুল হক সিকদার উইমেন্স মেডিকেল কলেজের নামে ২ কোটি এবং বিইএল কনস্ট্রাকশন এসডিএন বিএইচডি লিমিটেডের নামে ৫৬৯ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে।
পাওয়ার প্যাক হোল্ডিংস লিমিটেডের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও জামালপুরে পাওয়ার প্যাকের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে রয়েছে। কেরানীগঞ্জ ইউনিটটির উৎপাদন সক্ষমতা ১০০ মেগাওয়াট এবং জামালপুরের কেন্দ্রটি ৯৪ দশমিক ৮৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। দুটি ইউনিটের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১৯৪ দশমিক ৮৪ মেগাওয়াট। তবে এ দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামেই ব্যাংকঋণ রয়েছে ৩ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা।
সিকদার গ্রুপের বিদ্যুৎ খাতের একটি কোম্পানিতে বড় ঋণ দেয়া একটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, উদ্যোক্তা হিসেবে জয়নুল হক সিকদারের প্রতি আমাদের অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস ছিল। এজন্য তার কোম্পানিতে আমরা ঋণ দিতে কখনো কার্পণ্য করিনি। কিন্তু জয়নুল হক সিকদারের মৃত্যুর পর গ্রুপটির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে আমাদের মাঝে উদ্বেগ আছে। এখন ঋণের টাকা তুলে আনাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এক ট্রাক থেকে বৃহৎ শিল্প গ্রুপ
ধারদেনা করে ১৯৫৭ সালে একটি ট্রাক কিনেছিলেন ইপিআরে চাকরি করা জয়নুল হক সিকদার। ট্রাকটির চালক ছিলেন তিনি নিজেই এবং তার চাচাতো ভাই হাকিম ছিলেন হেলপার। প্রথম ট্রিপে বিমানবন্দর এলাকা থেকে খড় এনে তেজগাঁওয়ের কোহিনুর কেমিক্যাল কোম্পানিতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পান তারা। এর বিনিময়ে ভাড়া হিসেবে আয় হয় ১৫ টাকা। সেখান থেকেই উদ্যোক্তা হিসেবে তার যাত্রা শুরু হয়।
পরবর্তী ছয় দশকে সেই ব্যবসা বড় হয়ে একটি বৃহৎ শিল্প গ্রুপে রূপ নেয়। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় সিকদার গ্রুপের বিনিয়োগ রয়েছে। দেশের বাইরে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের অন্তত এক ডজন দেশে ব্যবসা সম্প্রসারিত হয়েছে সিকদার পরিবারের। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের তুলনায় বিদেশেই সিকদার গ্রুপের ব্যবসা বেশি।
জয়নুল হক সিকদারের আত্মজীবনীতেও সিকদার পরিবারের ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। ‘ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব’ নামের বইটি বদিউজ্জামান চৌধুরী লিখেছেন। আত্মজীবনীটি ন্যাশনাল ব্যাংকের ওয়েবসাইটেও আপলোড করা আছে।
বইটিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে ১২১০১ প্লামস বলভেরড, সিএ-৯০০৬৬ ঠিকানায় জয়নুল হক সিকদারের একটি বাড়ি রয়েছে। বেভারলি হিলস এফআর-১১৩০ ঠিকানায়ও একটি বাড়ি রয়েছে তার। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের ব্যবহারের জন্য আরও চারটি বাড়ি রয়েছে। দেশটিতে রিয়েল এস্টেট, এনার্জি ড্রিংকের কোম্পানি, গ্যাস স্টেশন ও অটোমেটিক কার ওয়াশিংয়ের ব্যবসাও রয়েছে সিকদার পরিবারের।
আত্মজীবনীতে যুক্তরাষ্ট্রে আটটি গ্যাস স্টেশন ও ১২টি অটোমেটিক কার ওয়াশিং সেন্টার থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। আমেরিকার বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও বাড়ি ও অবকাশ যাপন কেন্দ্র নির্মাণ করেছে সিকদার পরিবার।
সিকদার পরিবারের ব্যবসা করা কয়ি গ্রুপের হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ক্লাব, স্পা ও বিনোদনকেন্দ্র রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে। যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ডসহ ক্যারিবিয়ান দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতেও বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা রয়েছে।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতের পাশাপাশি আবাসন ব্যবসাতেও রয়েছে সিকদার গ্রুপের বিনিয়োগ। মুন্সীগঞ্জের নিমতলা, সিরাজদিখান, পটুয়াখালীর কুয়াকাটা, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, জামালপুর, বান্দরবানের নীলগিরি, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটির কাপ্তাই, খুলনাসহ বিভিন্ন জেলায় তাদের বিপণিবিতান, হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও আবাসন ব্যবসা রয়েছে। আর অ্যান্ড আর এভিয়েশনের অধীনে রয়েছে চারটি হেলিকপ্টার ও জেট ইঞ্জিনচালিত উড়োজাহাজ।
পড়ুন : ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার, পরিস্থিতি আরও খারাপের শঙ্কা
সা/


