আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা আনন্দের সঙ্গে উপস্থাপন করছে বাংলাদেশের শিল্পী ড. আবু কালাম শামসুদ্দীনের একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘যন্ত্রনার গান: অরিষড়বর্গ’ (The Song of Agony)। শুক্রবার, ২ অক্টোবর আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার লা গ্যালারিতে প্রদর্শনীর উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হবে।
ভারতীয় দর্শনচিন্তার ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত এই প্রদর্শনীতে মানবমনের ছয়টি অন্তর্নিহিত প্রবৃত্তি বা শত্রু হিসেবে পরিচিত অরিষড়বর্গ বা ষড়রিপুকে কেন্দ্র করে শিল্পী তাঁর ভাবনা তুলে ধরেছেন। এই ছয়টি প্রবৃত্তি হলো— কাম (অতৃপ্ত কামনা বা লালসা), ক্রোধ (রাগ), লোভ (অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা), মোহ (ভ্রান্তি বা আসক্তি), মদ (অহংকার) এবং মাৎসর্য (ঈর্ষা)। একগুচ্ছ চিত্রকর্মের মাধ্যমে শিল্পী অনুসন্ধান করেছেন, কীভাবে এসব প্রবৃত্তি মানুষের আচরণ ও পারস্পরিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে এবং ব্যক্তি, সমাজ ও প্রকৃতির ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
মানবসত্তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব ও আত্মোপলব্ধির দার্শনিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই প্রদর্শনী দর্শকদের নিজেদের স্বভাব ও আচরণের অপ্রকাশিত দিকগুলোর মুখোমুখি হতে আমন্ত্রণ জানায়। মানবমনের জটিল ও দ্বন্দ্বপূর্ণ প্রবৃত্তিগুলোকে দৃশ্যশিল্পের ভাষায় প্রকাশের মধ্য দিয়ে ড. আবু কালাম শামসুদ্দীন দর্শকদের নিজেদের আকাঙ্ক্ষা, কর্ম এবং দায়িত্ব নিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করেন। শিল্পীর ভাষায়, “একজন শিল্পী হিসেবে আমি অনুভব করি, পরিবেশ ও পৃথিবীর প্রতি আমারও দায়িত্ব রয়েছে।”
ব্যক্তিগত আত্মোপলব্ধির গণ্ডি পেরিয়ে যন্ত্রনার গান: অরিষড়বর্গ মানুষের অনিয়ন্ত্রিত আকাঙ্ক্ষা ও আত্মকেন্দ্রিক আচরণের কারণে প্রকৃতির ওপর সৃষ্ট নেতিবাচক প্রভাবের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। শিল্পী তুলে ধরেছেন, কীভাবে অজ্ঞতা, আসক্তি ও ব্যক্তিস্বার্থের অনুসরণ পরিবেশের অবক্ষয়, বন উজাড় এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার কারণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে, বন সংরক্ষণ, বন্যপ্রাণী রক্ষা এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
এই প্রদর্শনীতে চিত্রকলার ঐতিহ্যের সঙ্গে শিল্পীর নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উপকরণ ব্যবহারের নিজস্ব অন্বেষণও প্রতিফলিত হয়েছে। অজন্তার গুহাচিত্র এবং থাংকা চিত্রকলার কৌশল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ড. আবু কালাম শামসুদ্দীন সমকালীন উপকরণের সঙ্গে স্তরবিন্যাস ও টেক্সচারনির্ভর পৃষ্ঠ নির্মাণের সমন্বয়ে গড়ে তুলেছেন তাঁর স্বতন্ত্র শিল্পভাষা। বালি, কাদা, জিঙ্ক অক্সাইড ও অ্যাক্রিলিক রঙের মতো উপকরণ ব্যবহার করে তিনি ক্যানভাসে সৃষ্টি করেন স্পর্শগ্রাহ্য পৃষ্ঠতল ও অসমমিত বিন্যাস, যা জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক ভাবনাকে দৃশ্যমান রূপ দেয়।
মাটির কাছাকাছি বিভিন্ন রঙের পাশাপাশি মৃদু নীল, হলদে-সবুজ এবং সোনালি রঙের ব্যবহার তাঁর চিত্রকর্মের ভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। রং, টেক্সচার ও আকারের পারস্পরিক বিন্যাসের মধ্য দিয়ে তাঁর কাজগুলোতে চেতনা, দ্বন্দ্ব, রূপান্তর এবং আত্মিক জাগরণের মতো বিষয় উঠে এসেছে। বিশেষত, সোনালি রঙের ব্যবহার অন্তর্গত রূপান্তর, আত্মোপলব্ধি এবং আধ্যাত্মিক পূর্ণতার অনুসন্ধানকে প্রতীকীভাবে তুলে ধরে।
নিজের শিল্পচর্চার উদ্দেশ্য সম্পর্কে শিল্পী বলেন, “মানুষের আকাঙ্ক্ষা, আচরণ এবং প্রাকৃতিক জগতের মধ্যকার অদৃশ্য সম্পর্কগুলোকে প্রকাশ করা এবং নিজেদের কাজের পরিণতি উপলব্ধি করে তা পুনর্বিবেচনা করতে উৎসাহিত করাই এই প্রদর্শনীর লক্ষ্য।”
যন্ত্রনার গান: অরিষড়বর্গ প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে ড. আবু কালাম শামসুদ্দীন দর্শনচিন্তা, শিল্পের উপকরণগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং পরিবেশসচেতনতাকে একসূত্রে যুক্ত করেছেন। মানবপ্রকৃতির জটিলতা নিয়ে ভাবনার পাশাপাশি আমাদের চারপাশের জগতের সঙ্গে আরও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আত্মসচেতনতা ও সম্মিলিত দায়িত্ববোধের গুরুত্ব উপলব্ধি করার সুযোগ তৈরি করে এই প্রদর্শনী।
প্রদর্শনীর বিস্তারিত
উদ্বোধন: শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬টা
প্রদর্শনীর সময়কাল: ৩–১৩ অক্টোবর ২০২৬
দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত: প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা
ভেন্যু: লা গ্যালারি, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা
ঠিকানা: ২৬ মিরপুর রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা
প্রবেশ: সকলের জন্য উন্মুক্ত
পড়ুন : নেপালের লুম্বিনী আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘পানকৌড়ি’


