‘আমি এখন পথের ফকির হয়ে গেলাম। তিল তিল করে জমানো সব সঞ্চয় দিয়ে দোকানটি দাঁড় করিয়েছিলাম। এই দোকানের আয়েই আমার স্ত্রী-সন্তানদের মুখে ভাত জুটতো। এক রাতেই আমার সব স্বপ্ন এভাবে মাটিতে মিশে যাবে, তা কখনো ভাবিনি।’
পোড়া দোকানের ছাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে ডুকরে কেঁদে কেঁদে কথাগুলো বলছিলেন নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার কুল্লাগড়া ইউনিয়নের ধানীপাড়া গ্রামের মো. আজিজুল হক (৩৫)। অগ্নিকাণ্ডে সহায়-সম্বল হারিয়ে তিনি এখন পুরোপুরি নিঃস্ব। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সাজানো সুখের সংসারটি যেন শুক্রবার দিনগত রাতেই থমকে গেছে।
জানা যায়, ধানীপাড়া এলাকার ব্রিজ সংলগ্ন অজয় চন্দ্র সাহার ঘর ভাড়া নিয়ে গত প্রায় দেড় বছর ধরে মুদি দোকান চালিয়ে আসছিলেন মৃত আব্দুল বাতেনের ছেলে আজিজুল। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিদিন রাতেই তিনি দোকানে ঘুমাতেন। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে শুক্রবার রাতে তিনি বাড়িতে ছিলেন। আর এই সুযোগটিই কাজে লাগায় দুর্বৃত্তরা।
ধারণা করা হচ্ছে, শুক্রবার গভীর রাত আনুমানিক ১টার দিকে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা শত্রুতার জেরে দোকানটিতে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পেয়ে আশপাশের লোকজন পানি নিয়ে ছুটে আসার আগেই দোকানের সমস্ত মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
আজিজুল হকের বুকফাটা আর্তনাদ যেন ভারী করে তুলেছে ধানীপাড়ার বাতাস। তিনি জানান, নিজের জীবনের সব জমানো টাকা দিয়ে তিনি দোকানটি সাজিয়েছিলেন। সম্প্রতি একটি বড় ফ্রিজও কিনেছিলেন। ঘটনার রাতে দোকানে নগদ টাকাও রাখা ছিল। সবকিছু হারিয়ে তার ক্ষতি হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষাধিক টাকার।
আজিজুল বলেন, ‘আমার জানামতে কারও সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ নেই। দোকানটি দিয়ে আমি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে একটু ভালোভাবে চলতে পারছিলাম, হয়তো এটাই অনেকের সহ্য হচ্ছিল না। সেই আক্রোশ থেকেই কেউ আমার সঙ্গে এমন নির্মম শত্রুতা করেছে।’
স্থানীয়রাও এমন আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হতবাক। ধানীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. আব্দুল মন্নান আক্ষেপ করে বলেন, ‘আজিজুল অত্যন্ত শান্ত ও ভালো স্বভাবের ছেলে। এলাকায় কারও সঙ্গে তার কোনো ঝগড়া-বিবাদ নেই। এত অল্প সময়ের মধ্যে এমন দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠাটা স্বাভাবিক নয়। আমরাও মনে করছি, কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়েছে। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।’
সব হারিয়ে আজিজুল হক এখন দিশেহারা। এরই মধ্যে এলাকাবাসীর সহায়তায় তিনি দুর্গাপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।
পুলিশ প্রশাসনের কাছে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার আকুল আবেদন জানিয়েছেন এই মুদি দোকানি। একইসঙ্গে, স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে খেয়ে-পরে বাঁচার জন্য উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সারের কাছে জরুরি আর্থিক সহায়তার জোর দাবি জানিয়েছেন নিঃস্ব আজিজুল। সামান্য সহায়তাই হয়তো আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে পারে পথে বসা এই পরিবারটিকে।
পড়ুন : বিএনপির নাম ভাঙিয়ে জায়গা দখলের চেষ্টার অভিযোগ


