সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামকে ‘মেয়েদের প্ল্যাটফর্ম’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক। তার এই মন্তব্যকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কেউ মাস্কের বক্তব্যকে সমর্থন করলেও অনেকে এটিকে লিঙ্গবৈষম্যমূলক ও আপত্তিকর মন্তব্য হিসেবে সমালোচনা করেছেন।
সম্প্রতি এক্সে (সাবেক টুইটার) জাইগার ক্যাপিটাল নামের এক ব্যবহারকারী ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলার সিদ্ধান্তের কথা জানান। নিজের পোস্টে ওই ব্যবহারকারী ইনস্টাগ্রামকে মূলত নারীদের জন্য তৈরি একটি অ্যাপ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং এতে তার কোনো উপকার দেখেন না বলে মন্তব্য করেন।
ওই পোস্টের জবাব দিতে গিয়ে ইলন মাস্ক সংক্ষেপে লেখেন, ‘ইনস্টাগ্রাম মেয়েদের জন্য।’ মাত্র কয়েকটি শব্দের এই মন্তব্য দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই মাস্কের বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে শুরু করে।
অনেক ব্যবহারকারী মনে করছেন, ইনস্টাগ্রামে নারীদের ব্যবহার তুলনামূলক বেশি হলেও পুরো প্ল্যাটফর্মকে শুধু মেয়েদের জন্য বলে চিহ্নিত করা ঠিক নয়। তাদের মতে, ইনস্টাগ্রাম বিভিন্ন বয়স, পেশা ও লিঙ্গের মানুষের জন্য উন্মুক্ত একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ফলে কোনো একটি নির্দিষ্ট লিঙ্গের সঙ্গে পুরো প্ল্যাটফর্মকে যুক্ত করা বিভ্রান্তিকর।
অন্যদিকে, কেউ কেউ মাস্কের বক্তব্যকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের একটি পর্যবেক্ষণ হিসেবে দেখছেন। তাদের যুক্তি, ইনস্টাগ্রামে ছবি, ভিডিও, স্টোরি ও ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন মুহূর্ত শেয়ার করার প্রবণতা অনেক ব্যবহারকারীর মধ্যে থাকলেও নারীদের মধ্যে এ ধরনের ব্যবহার বেশি দৃশ্যমান হতে পারে। তবে এ ধরনের প্রবণতার ভিত্তিতে পুরো প্ল্যাটফর্মকে ‘মেয়েদের’ বলে আখ্যা দেওয়া নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে।
ইনস্টাগ্রাম নিয়ে এবারই প্রথম এমন মন্তব্য করেননি মাস্ক। চলতি বছরের মে মাসেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের অভ্যাস নিয়ে একটি ভাইরাল আলোচনায় একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন তিনি। তখনও তার বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছিল।
ওই আলোচনায় ইনস্টাগ্রামে ছবি পোস্ট করা, দিনের বিভিন্ন সময়ে স্টোরি দেওয়া এবং নিজের তৈরি খাবারের ছবি শেয়ার করার মতো বিষয় উঠে আসে। এসব প্রসঙ্গের সঙ্গে ইনস্টাগ্রামের ব্যবহারকে যুক্ত করে মাস্ক প্ল্যাটফর্মটিকে নারীদের সঙ্গে সম্পর্কিত করে মন্তব্য করেন।
এর পাশাপাশি ওই সময় প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের প্রসঙ্গেও বিতর্কিত মন্তব্য করেন তিনি। কোনো পুরুষ নিজের ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল তার কাছে পাঠালে তিনি লিঙ্গান্তর করছেন কি না—এমন প্রশ্নও তোলেন মাস্ক। তার এই বক্তব্যের পরও অনলাইনে ব্যাপক সমালোচনা হয়।
অনেক ব্যবহারকারী তখন মাস্কের মন্তব্যকে লিঙ্গবৈষম্যমূলক হিসেবে উল্লেখ করেন। তাদের মতে, কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন ব্যক্তির উপস্থিতি বা ব্যবহারের ধরন দেখে তার লিঙ্গপরিচয় কিংবা যৌন পরিচয় সম্পর্কে অনুমান করা অনুচিত। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকে নারী বা পুরুষের জন্য আলাদা করে দেখাও আধুনিক অনলাইন সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেন তারা।
এবারের নতুন মন্তব্যের পরও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এক ব্যবহারকারী মাস্কের বক্তব্যের জবাবে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘তাহলে এক্স কাদের জন্য?’ এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, যদি ইনস্টাগ্রামকে নারীদের প্ল্যাটফর্ম বলা হয়, তাহলে মাস্কের মালিকানাধীন এক্সকেও কি একইভাবে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত?
আরেক ব্যবহারকারীও এক্স নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মন্তব্য, ‘এক্সের ক্ষেত্রে কী বলবেন?’ এর মাধ্যমে ইনস্টাগ্রাম ও এক্স—দুই প্ল্যাটফর্মের ব্যবহারকারীদের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়।
তৃতীয় এক ব্যবহারকারী মাস্কের বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি দ্বিমত পোষণ করে বলেন, তার মতে ইনস্টাগ্রাম সব লিঙ্গের মানুষের জন্যই উন্মুক্ত এবং স্বাগত জানানোর জায়গা। অন্য একজন আরও সরাসরি মন্তব্য করে বলেন, ‘ইনস্টাগ্রাম সবার জন্য।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীদের আচরণ, বয়স, লিঙ্গ ও আগ্রহের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও কোনো একটি প্ল্যাটফর্মকে নির্দিষ্ট লিঙ্গের সঙ্গে এককভাবে যুক্ত করা সহজেই বিতর্ক তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ছবি ও ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ইনস্টাগ্রামের ব্যবহারকারী বৈচিত্র্য অনেক বেশি।
মাস্কের সাম্প্রতিক মন্তব্য তাই শুধু ইনস্টাগ্রাম নিয়ে নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার, লিঙ্গভিত্তিক ধারণা এবং অনলাইন সংস্কৃতি নিয়েও নতুন করে আলোচনা সামনে এনেছে। একই সঙ্গে এটি আবারও দেখিয়েছে, ইলন মাস্কের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা সংক্ষিপ্ত মন্তব্যও কত দ্রুত ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
ইনস্টাগ্রামকে ‘মেয়েদের প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে মাস্কের মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক কতদিন স্থায়ী হয়, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি প্রশ্নই ঘুরছে—কোনো প্ল্যাটফর্ম কি আসলেই নির্দিষ্ট কোনো লিঙ্গের জন্য, নাকি অনলাইন দুনিয়া সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত হওয়া উচিত?
পড়ুন:কর ফাঁকি রুখতে বিলাসবহুল গাড়ির মালিকদের খুঁজছে এনবিআর
ইমি/


