প্রেম, পরিণয় আর একসঙ্গে পথ চলার প্রতিশ্রুতি—একটি সম্পর্কের শুরুটা হয় এমনই এক মায়াবী আবহে। দুজন মানুষ যখন একে অপরের হাত ধরে নতুন জীবনের স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন, তখন চারপাশের পৃথিবীটাও যেন আরও একটু সুন্দর হয়ে ওঠে। দাম্পত্য মানেই মান-অভিমান, খুনসুটি আর দিনের শেষে একে অপরের কাঁধে মাথা রাখার নির্ভরতা। কিন্তু সেই নির্ভরতার খুঁটি যখন হঠাৎ ধসে পড়ে, তখন শুধু দুজন মানুষই নন, থমকে যান তাদের ঘিরে থাকা অগণিত শুভাকাঙ্ক্ষীও।
বিশেষ করে তারকাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বেশি আলোড়ন তোলে। পর্দায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাদের সুখী জীবনের ছবি দেখে ভক্তরা নিজেদের স্বপ্নের সঙ্গে মিল খুঁজে নেন, সেই তারকাদের সম্পর্ক যখন ভেঙে যায়, তখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—সম্পর্কের আসলে স্থায়িত্ব কোথায়?
এমনই এক প্রশ্নের জন্ম দিয়ে বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে তারকা জুটি প্রীতম হাসান ও শেহতাজ মুনিরা হাশেমের বিচ্ছেদের খবর। রোববার (৪ অক্টোবর) রাতে এক যৌথ বিবৃতিতে নিজেদের বিচ্ছেদের বিষয়টি জানান তারা। দীর্ঘ ১০ বছরের সম্পর্কের মধ্যে চার বছরের দাম্পত্য জীবনের পর তাদের এই সিদ্ধান্তে হতবাক ভক্তরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের পুরোনো ছবি, ভিডিও ও আবেগঘন মুহূর্তের স্মৃতি শেয়ার করে অনেকেই আক্ষেপ প্রকাশ করছেন।
চলতি বছর দেশের শোবিজ অঙ্গনে বিচ্ছেদের খবরের তালিকায় আরও কয়েকটি নাম এসেছে। জনপ্রিয় গায়ক ও অভিনেতা তাহসান খান এবং রোজা আহমেদের সম্পর্ক নিয়েও বছরের শুরুতে তৈরি হওয়া নানা গুঞ্জনের অবসান ঘটে। জানুয়ারিতে তাহসান নিজেই তাদের বিচ্ছেদের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে কবে এবং কেন তারা এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।
অন্যদিকে সরাসরি বিচ্ছেদের ঘোষণা না এলেও মিথিলা ও সৃজিত মুখার্জিকে ঘিরে আলোচনা থামেনি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বিয়ের পর বাংলাদেশি অভিনেত্রী রাফিয়াত রশীদ মিথিলা ও ভারতীয় নির্মাতা সৃজিত মুখার্জিকে ঘিরে দুই বাংলার দর্শকের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। তবে বেশ কিছুদিন ধরে তাদের একসঙ্গে দেখা না যাওয়ায় সম্পর্কের দূরত্ব নিয়ে নানা জল্পনা চলছে।
সম্প্রতি এক পডকাস্টে সৃজিত নিজের একাকিত্বের কথা বলেছেন। কখনো কাজ, সংগীত ও বন্ধুদের নিয়ে সময় কাটালেও কখনো একাকিত্ব অনুভব করেন—এমন বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। মিথিলার নাম সরাসরি উচ্চারণ না করলেও তার এই মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে মিথিলা যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। তাদের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা নিয়ে অবশ্য দুজনের পক্ষ থেকেই স্পষ্ট কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তারকাদের ব্যক্তিজীবনে বিচ্ছেদের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালেও দেশের শোবিজ অঙ্গনে একাধিক তারকা দম্পতির সম্পর্কে ভাঙনের খবর সামনে এসেছিল। সংগীতশিল্পী দিলশাদ নাহার কনা দীর্ঘদিনের দাম্পত্য জীবনের ইতি টানার খবর জানান। ছয় বছরের সংসারের পর বনিবনা না হওয়ায় তাদের সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটে। একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে সংগীতশিল্পী হৃদয় খানও তার তৃতীয় বিয়ের বিচ্ছেদের কথা জানান। সাত বছরের বেশি সময়ের সেই সম্পর্কও শেষ হয়ে যায়।
তারকাদের বিচ্ছেদের খবর সাধারণ মানুষের মনে এতটা প্রভাব ফেলে কেন—এর পেছনে রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও। নিউইয়র্কভিত্তিক সাইকোথেরাপিস্ট ক্যাথরিন শেফলার ‘টাইম’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক লেখায় বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন।
তার মতে, মানুষ সাধারণত তারকাদের একটি ‘পারফেক্ট’ বা নিখুঁত জুটি হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। তাদের সৌন্দর্য, সাফল্য, অর্থ ও জনপ্রিয়তা দেখে অনেকের মনে ধারণা তৈরি হয়—তাদের জীবনেও হয়তো সবকিছু সুন্দরভাবে চলছে। ফলে সেই সম্পর্ক ভেঙে গেলে ভক্তদের মনে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।
অবচেতনভাবে অনেকেই ভাবতে শুরু করেন, এত সফল ও আকর্ষণীয় মানুষও যদি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে না পারেন, তাহলে সাধারণ মানুষের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী? এখানেই তারকাদের বিচ্ছেদ ব্যক্তিগত ঘটনা থেকে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের মানসিক জগতে প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
ক্যাথরিন শেফলারের মতে, শুধু ভালোবাসা দিয়ে একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায় না। এর সঙ্গে প্রয়োজন কার্যকর যোগাযোগ, পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি, আস্থা এবং আর্থিক ও মানসিক ঘনিষ্ঠতা। এসব বাস্তব বিষয় দুর্বল হয়ে গেলে সম্পর্কের ভিত্তিও নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে।
তারকা ও ভক্তদের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘প্যারাসোশ্যাল’ বা একপাক্ষিক সম্পর্ক। মার্কিন গণমাধ্যম এনপিআরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও ব্রেকআপ কোচ ড. আন্দ্রিয়া লাইনার বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে তারকা ও ভক্তদের মধ্যে এই একপাক্ষিক সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।
আগে একজন তারকার ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে জানতে হলে সংবাদমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তারকার দৈনন্দিন জীবনের অনেকটাই ভক্তদের চোখের সামনে চলে আসে। কে কোথায় গেলেন, কার সঙ্গে সময় কাটালেন, কীভাবে জন্মদিন উদযাপন করলেন—এসব মুহূর্ত নিয়মিতই শেয়ার করেন তারকারা।
ফলে ভক্তদের কাছে তারকারা অনেকটা পরিচিত মানুষের মতো হয়ে ওঠেন। তাদের সুখে আনন্দ এবং দুঃখে কষ্ট পাওয়ার অনুভূতিও তৈরি হয়। তাই সম্পর্ক ভেঙে গেলে অনেক ভক্ত সেটিকে নিজেদের পরিচিত কারও সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার মতো করেই অনুভব করেন।
বর্তমান সময়ে দাম্পত্য সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবও ক্রমেই আলোচনায় আসছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার সম্পর্কের বাস্তব যোগাযোগকে দুর্বল করে দিতে পারে। কর্মব্যস্ততা কিংবা দূরত্বের কারণে স্বামী-স্ত্রীর সামনাসামনি কথা বলার সময় কমে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই মেসেজিং অ্যাপ হয়ে উঠছে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম।
মন খারাপ, অভিমান কিংবা ঝগড়ার মতো ব্যক্তিগত বিষয়ও কখনো কখনো চলে যাচ্ছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। ফলে সম্পর্কের আবেগ অনেকটা ভার্চুয়াল হয়ে পড়ছে।
ডিজিটাল যোগাযোগের আরেকটি সমস্যা হলো—এখানে অনেক কিছুই থেকে যায়। রাগের মাথায় পাঠানো একটি বার্তা বা পুরোনো কোনো ছবি বহু বছর পরও খুঁজে পাওয়া সম্ভব। সামনাসামনি ঝগড়ার পর মানুষ হয়তো বিষয়টি ভুলে যেতে পারেন, কিন্তু পুরোনো ডিজিটাল স্মৃতি হঠাৎ সামনে এলে সেই ক্ষত আবারও জেগে উঠতে পারে।
অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাজানো-গোছানো জীবন দেখে নিজের সম্পর্কের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতাও বাড়ছে। অন্যের সুখী মুহূর্তের ছবি দেখে অনেকেই নিজের জীবনের বাস্তব সমস্যাকে আরও বড় করে দেখতে শুরু করেন। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা ছবির আড়ালে থাকা বাস্তবতা সাধারণত জানা যায় না।
সব মিলিয়ে তারকাদের বিচ্ছেদ যেমন ভক্তদের আবেগে নাড়া দেয়, তেমনি তা সম্পর্কের বাস্তবতা নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে শুধু ভালোবাসা নয়, প্রয়োজন বিশ্বাস, যোগাযোগ, সম্মান, সময় এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া। তারকারা হোন কিংবা সাধারণ মানুষ—সম্পর্কের এই মৌলিক সত্যের বাইরে কেউই নন।
তাই তারকাদের বিচ্ছেদকে শুধু বিনোদনের খবর হিসেবে না দেখে সম্পর্কের জটিল বাস্তবতার একটি প্রতিচ্ছবি হিসেবেও দেখা যায়। কারণ পর্দার আলো কিংবা জনপ্রিয়তার আড়ালেও তারকারা শেষ পর্যন্ত মানুষ—তাদেরও থাকে আবেগ, অভিমান, সংকট এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার কঠিন বাস্তবতা।
পড়ুন:ডিজেলের দাম কমাতে ট্রাম্পের নতুন আদেশ
ইমি/


