রামপালে দেশের সবচেয়ে বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে

বাগেরহাটের রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা জমিতে নির্মাণ করা হবে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটিই হবে দেশের সবচেয়ে বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকল্পটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিজ্ঞাপন

‘কনস্ট্রাকশন অব ৪৪২ মেগাওয়াট সোলার ফটোভোল্টাইক গ্রিড কানেক্টেড পাওয়ার প্লান্ট অ্যাট ব্লক-বি রামপাল’ নামের প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে।

প্রকল্পে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রতি ইউনিটের ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ১৮ টাকা। সম্প্রতি অনুমোদন পাওয়া ফেনীর সোনাগাজী সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের তুলনায় এই দর প্রায় ৩০ শতাংশ কম। সোনাগাজীর প্রকল্পে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দর নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ দশমিক ৮৭ টাকা। ফলে রামপালের নতুন প্রকল্পটি তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে রামপালের এই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো)। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ১২৭ কোটি টাকা আসবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিল (পিডিএফ) থেকে। বাকি ৩৭৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা বিউবো নিজস্ব তহবিল থেকে বহন করবে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কম দামে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে দেশের গড় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের ওপর চাপ কমবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুতের দাম ও গ্রাহকের বিল সহনীয় রাখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এ ছাড়া প্রকল্পটির নির্মাণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিভিন্ন পর্যায়ে বাগেরহাট, খুলনা ও আশপাশের এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ায় সমপরিমাণ কয়লা বা গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় কার্বন নিঃসরণও কমবে। এতে উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ ও বায়ুর মানের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে সৌরবিদ্যুতের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। সূর্যের আলো না থাকায় রাতে এই উৎস থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব নয়। রামপালের প্রকল্পের ক্যাপাসিটি ইউটিলাইজেশন ফ্যাক্টর বা সক্ষমতা ব্যবহারের হার ধরা হয়েছে ১৭ শতাংশ। ফলে সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে অন্যান্য বিদ্যুৎ উৎস অথবা ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে।

রামপাল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এর জন্য নতুন করে বড় পরিসরে জমি অধিগ্রহণ করতে হবে না। ২০১২ সালে রামপালে কয়লাভিত্তিক ও অন্যান্য বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য মোট ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড।

অধিগ্রহণ করা সেই জমির ‘ব্লক-বি’ অংশেই নির্মাণ করা হবে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি। এই ব্লকের মোট আয়তন ৯১৮ দশমিক ৫০ একর। গ্রিন বেল্ট, বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ, লেক ও নিচু জমি বাদ দেওয়ার পর সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ব্যবহারযোগ্য ৬৮৫ একর জমি চূড়ান্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ ব্লকের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জমি প্রকল্পে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

জমি আগে থেকেই বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের দখলে থাকায় নতুন করে জমি অধিগ্রহণ কিংবা বড় ধরনের ভূমি উন্নয়ন করতে হবে না। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এই সুবিধার কারণে প্রকল্পের অবকাঠামোগত ব্যয় কমেছে। আর ব্যয় কম হওয়ায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দামও তুলনামূলকভাবে কম রাখা সম্ভব হচ্ছে।

প্রাথমিকভাবে আন্তর্জাতিক যৌথ উদ্যোগ বা জেভির মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে বিদ্যুতের বিশেষ বিধান আইন ২০১০ (সংশোধিত ২০২১) বাতিল হওয়ার পর সরকার সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসে।

এরপর গত বছরের মে মাসে সরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি) পরিচালিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রকল্পটি সম্পূর্ণ গ্রিড-সংযুক্ত হবে এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে এককভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।

দেশে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টারপ্ল্যান (আইইপিএমপি) ২০২৩-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা দাঁড়াতে পারে ২৯ হাজার ২৫৭ মেগাওয়াটে। ২০৫০ সালে এই চাহিদা প্রায় ৯৬ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে।

এখন পর্যন্ত দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট। ফলে ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা-২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। নীতিমালায় ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

রামপালের ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সেই লক্ষ্য অর্জনে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে আগে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য নেওয়া জমিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে ব্যবহার করা হলে জমির কার্যকর ব্যবহারও নিশ্চিত হবে। কম উৎপাদন ব্যয়, নতুন জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন না থাকা এবং পরিবেশগত সুবিধার কারণে প্রকল্পটি দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে।

পড়ুন:অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় চাপ, সাহসী সংস্কার চায় বিশ্বব্যাংক

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন