দেশের মানুষের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য ও কার্যকর করতে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে চালু করা হচ্ছে নতুন পরিচালন কাঠামো। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ ও থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের আদলে এখানে চালু হবে ওয়ান-স্টপ ইমার্জেন্সি সার্ভিস মডেল।
আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গরূপে চালু করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বিএমইউর এই সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল। তবে আগের কাঠামোর পরিবর্তে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালিত হবে হাসপাতালটি। এ জন্য দ্রুতই আলাদা পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হবে। নতুন কাঠামোয় নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সুযোগ থাকবে না।
দুই-তিন মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ চালুর লক্ষ্য
সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, ‘আশা করছি আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গরূপে চালু করতে পারব। প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালিত হবে এ হাসপাতালটি।’
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, নতুন ব্যবস্থাপনায় বিএমইউর উপাচার্য হাসপাতালের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে একজন উপ-উপাচার্যকে। পাশাপাশি করপোরেট হাসপাতাল পরিচালনায় অভিজ্ঞ একজনকে বাইরে থেকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।
আলাদা পরিচালনা পর্ষদ, বাইরে থেকে সিইও
হাসপাতাল পরিচালনার জন্য আলাদা পরিচালনা পর্ষদ গঠনের পাশাপাশি করপোরেট ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ কাঠামোর আওতায় হাসপাতালের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
বিএমইউর উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আগামী ৮ অক্টোবর সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হবে। এর পরই যতদ্রুত সম্ভব প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগ দেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘যত দ্রত সম্ভব সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি চালু করব। তবে এটি ধাপে ধাপে চালু করতে হবে, কারণ হাসপাতালের অনেক কিছুই সংস্কার করতে হবে। আমরা সব কিছু নিয়ম মেনে করতে চাই।’
বর্তমান চিকিৎসক-নার্সরা থাকছেন না
হাসপাতালের নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য সহায়ক সেবা প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে দক্ষ প্রতিষ্ঠানের কাছে আউটসোর্স করা হবে। তবে বিএমইউতে বর্তমানে কর্মরত চিকিৎসক ও নার্সরা সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে কাজ করবেন না।
চিকিৎসক, নার্সসহ হাসপাতালের প্রয়োজনীয় অন্যান্য জনবল বাইরে থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে। কেউ সরকারি চাকরি ছেড়ে এই হাসপাতালে যোগ দিতে চাইলে সেই সুযোগ থাকবে। তবে নতুন কাঠামোয় সব জনবলকেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হবে।
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি দক্ষ জনবল নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। স্থায়ী নিয়োগের পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ ও যোগ্য জনবল নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সুযোগ থাকবে না
নতুন ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসকদের বাইরে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সুযোগ না দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। এর পরিবর্তে হাসপাতাল থেকেই তাদের ভালো বেতন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিএমইউর কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গেলে প্রতিযোগিতামূলক বেতন ও সুবিধা দিয়ে যোগ্য এবং দক্ষ চিকিৎসকদের হাসপাতালে যুক্ত করা সহজ হবে।
৯০ শতাংশ শেয়ার বিএমইউর
বিএমইউর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি পরিচালিত হবে একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির মাধ্যমে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯০ শতাংশ এবং সরকারের ১০ শতাংশ শেয়ার থাকবে।
হাসপাতালের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই করপোরেট মডেল গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নিয়োগের পাশাপাশি হাসপাতালের কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা নিতে দেশের মানুষের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমবে বলেও আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইনেও এসেছে পরিবর্তন
সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটির পরিচালনা সহজ করা এবং চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে গত ১৩ জুলাই বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (দ্বিতীয় সংশোধন) বিল, ২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্বলিত বিবৃতিতে বলা হয়, দেশে উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৯৮ অনুযায়ী বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই আইনগত পরিবর্তনের পরই সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল পরিচালনায় নতুন কাঠামো তৈরির প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
পূর্ণাঙ্গ চালুর জন্য সাত সদস্যের কমিটি
হাসপাতালটি পুরোদমে চালু এবং বিদ্যমান জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যে গত ১১ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। বিএমইউর উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদকে কমিটির আহ্বায়ক এবং হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সীকে সদস্যসচিব করা হয়।
কমিটির মাধ্যমে হাসপাতালটির কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
এক ছাদের নিচে পাঁচ বিশেষায়িত কেন্দ্র
বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে রয়েছে পাঁচটি বিশেষায়িত কেন্দ্র। এর মধ্যে রয়েছে কার্ডিও অ্যান্ড সেরিব্রোভাসকুলার সেন্টার, হেপাটোবিলিয়ারি অ্যান্ড লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেন্টার, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা সেন্টার, কিডনি রোগ ও ইউরোলজি সেন্টার এবং জরুরি ও ট্রমা সেন্টার।
এ ছাড়া হাসপাতালটিতে রয়েছে ১৪টি অপারেশন থিয়েটার, ১০০ শয্যার আইসিইউ, ১০০ শয্যার জরুরি ইউনিট, ছয়টি ভিভিআইপি কেবিন, ২২টি ভিআইপি কেবিন এবং ২৫টি ডিলাক্স কেবিন।
১ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকার হাসপাতাল, এতদিন সীমিত সেবা
১ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৭৫০ শয্যার এই হাসপাতাল উদ্বোধন করা হয় ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে। কিন্তু উদ্বোধনের পরও হাসপাতালটির জন্য নির্দিষ্ট জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
ফলে বিএমইউর বর্তমান কর্মী ও বাজেটের ওপর নির্ভর করেই সেখানে সীমিত পরিসরে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। এবার চুক্তিভিত্তিক জনবল নিয়োগ, আলাদা পরিচালনা কাঠামো এবং করপোরেট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে হাসপাতালটিকে পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই বিএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল পূর্ণাঙ্গরূপে চালু হবে। তখন উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে দেশের মানুষের সামনে নতুন একটি সুযোগ তৈরি হবে।
সূত্র: বাসস
পড়ুন: ইসরাইলি হামলার ৩ বছর: হামাস কী হারিয়েছে গাজার নিয়ন্ত্রণ?
আর/


