সাদামাটা পোশাক, চারপাশে পুলিশের বেষ্টনী, আর মাথানত মলিন মুখ – সময় যেন এক নিমিষেই বদলে দিয়েছে একসময়কার দাপুটে পরিচিত মুখগুলোকে। অথচ মাত্র আড়াই বছর আগেও চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ক্ষমতার দাপট, হুংকার আর জৌলুসে তাদের সামনে যেন ম্লান হয়ে যেত চারপাশের সবাই। কথায় ছিলো কর্তৃত্ব, চলনে ছিলো দাপট, আর চেহারায় ফুটে উঠতো ক্ষমতার আত্মবিশ্বাস।
কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলে বদলে গেছে দৃশ্যপট। যে মুখগুলো একসময় ছিলো পাদপ্রদীপের আলোয়, আজ তারাই অনেকটা নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো। সময় সত্যিই বড় নির্মম – ক্ষমতা কেড়ে নিলে বদলে যায় মানুষের পোশাক, বদলে যায় চোখের ভাষা, এমনকি বদলে যায় চেহারার জৌলুসও।
চলুন, ফিরে তাকাই মাত্র আড়াই বছর আগের সেই দিনগুলোতে – দেখে আসি, কেমন ছিলো ক্ষমতার শীর্ষে থাকা এই পরিচিত মুখগুলোর সেই দাপুটে চেহারা।
পাদপ্রদীপের আলো থেকে আদালতের কাঠগড়ায়। মন্ত্রীত্বের চেয়ার থেকে কারাগারের চার দেয়ালে। মাইক্রোফোনের সামনে থেকে হাজিরা দেওয়ার সারিতে।
একসময় যাদের এক ফোনে বদলে যেতো সিদ্ধান্ত, আজ তাদের অনেকের দিন কাটে পরবর্তী শুনানির তারিখ গুনে। সালমান এফ রহমান, আনিসুল হক, জুনাইদ আহমেদ পলক, দীপু মনি, আমির হোসেন আমু, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, কামরুল ইসলাম, কামাল আহমেদ মজুমদার, গোলাম দস্তগীর গাজী, আসাদুজ্জামান নূর – মাত্র আড়াই বছর আগেও রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।
গত প্রায় দেড় দশকের দাপুটে এসব নেতাদের নতুন ঠিকানা এখন আদালতের কাঠগড়া আর জেল খানার উচু দেয়াল। কেউ হাজিরা দেন ভার্চ্যুয়ালি, কেউ প্রিজনভ্যানে চড়ে, কেউ আবার আদালতে এসে চান চিকিৎসার সুযোগ কিংবা আইনজীবীর সঙ্গে বাড়তি সময়।
জুনাইদ আহমেদ পলক যতবার আদালতে হাজির হয়েছেন ততবার মিডিয়ার ক্যামেরা দেখলেই কোন না কোন বক্তব্য দিয়ে ভাইরাল হয়েছেন। আবার কেউ চিৎকার করে বিচারকার্যের সমালোচনা করছেন, তবে বেশির ভাগ হাইব্রিড নেতাই মাথা নিচু করে আদালত চত্ত্বরে আসছেন, মাঝে মধ্যে মলিন চেহারায় কৌতুহল নিয়ে এদিকে সেদিক তাকাচ্ছেন। যে পুলিশ সদস্যদের হাত একসময় এসব নেতাদের দেখলে সেল্যুট করার জন্য উঠতো- সেই হাতগুলো আজ শক্তভাবে আকড়ে ধরে আছে তাদের শরীর কিংবা বাহু।
ক্ষমতার করিডোরে যেখানে এসির ঠান্ডা বাতাস, সেখানে এখন কারাগারের গরম নিয়ে অভিযোগ। যেখানে একসময় ছিলো রাষ্ট্রীয় গাড়ির কাচ, সেখানে এখন প্রিজনভ্যানের গ্রিল। যেখানে ছিলো ক্ষমতার হাসি – সেখানে অনেক মুখে এখন ক্লান্তির ছাপ।
সময়ের আয়নায় পরিবর্তনটা স্পষ্ট। অর্থাৎ গল্পটা শুধু চেহারা বদলের নয় – গল্পটা ক্ষমতার অবস্থান বদলের। যে মুখগুলো একসময় সিদ্ধান্ত দিতো, আজ তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন। যে হাত একসময় ফাইল সই করতো, আজ সেই হাত হ্যান্ডকাফে আটকে আছে। যে কণ্ঠ একসময় মঞ্চ কাঁপাতো, আজ সেই কণ্ঠ আদালতে নিজের পক্ষে সাফাই গাইতে বাধ্য করছে। আর সময়?
সময় যেন নীরবে বসে আছে বিচারকের আসনে।
আড়াই বছর আগে তারা ছিলেন পাদপ্রদীপের আলোয়। আজ সেই আলো বদলে গেছে। চেহারায় হয়তো ক্লান্তির ছাপ, চোখে অনিশ্চয়তা, কপালে দুশ্চিন্তার রেখা। তবে এও সময়ের এক নির্মম শিক্ষা – ক্ষমতার মঞ্চ যত উঁচুই হোক, কৃতকর্মের পর্দা একদিন নামবেই। তখন প্রটোকল থাকে না, থাকে না গাড়ির বহর, থাকে না করতালির শব্দ। থাকে শুধু- মামলার কাগজ, আদালতের তারিখ, কাঠগড়ার কয়েকটি মুহূর্ত আর কৃতকর্মের ইতিহাসের কঠিন সব প্রশ্ন।
দেখুন: ক্ষমতার আয়নায় ভাঙা চেহারা: বদলে গেল প্রভাবশালীদের জীবন
পড়ুন: রসায়নে নোবেল পেলেন ফ্রান্স ও জাপানের ২ বিজ্ঞানী


