মাটির কাঠামোয় খড়ের বাঁধন, তার ওপর মাটির প্রলেপ। সেই মাটির অবয়বেই এখন প্রাণের ছোঁয়া দিচ্ছেন শিল্পীরা। কারও হাতে রং-তুলি, কেউ ব্যস্ত প্রতিমার অলংকার ও সাজসজ্জায়। সকাল থেকে রাত—কেটে যাচ্ছে ব্যস্ততায়। মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। রঙের আঁচড়ে ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাচ্ছেন দেবী দুর্গা। অপেক্ষা এখন শুধু ঢাকের বোল আর শঙ্খধ্বনিতে উৎসব শুরুর।
শারদীয় দুর্গাপূজা সামনে রেখে জামালপুরে প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। মাটির কাজ শেষ করে এখন চলছে রং ও সাজসজ্জার কাজ। জেলার সাতটি উপজেলায় এবার ২২৭টি পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসব উদযাপিত হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা মণ্ডপে পৌঁছে দিতে দিন-রাত কাজ করছেন প্রতিমাশিল্পীরা।
জেলার বিভিন্ন মন্দির ও মণ্ডপ ঘুরে দেখা যায়, কোথাও প্রতিমায় শেষবারের মতো রঙের প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে, কোথাও চলছে অলংকার ও পোশাক পরানোর কাজ। পাশাপাশি মণ্ডপ সাজাতেও ব্যস্ত আয়োজকেরা। আলোকসজ্জা, তোরণ ও বিভিন্ন নান্দনিক সাজে উৎসবের আমেজ তৈরি হচ্ছে মণ্ডপগুলোতে।
প্রতিমাশিল্পী হৃদয় সূত্রধর বলেন, ‘দিন-রাত এক করে কঠোর পরিশ্রম করছি। কাজ প্রায় শেষের দিকে। প্রতিমা তৈরি আমাদের কাছে শুধু পেশা নয়, এর সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতি ও ভালোবাসা জড়িয়ে আছে। নিজের হাতে তৈরি প্রতিমা যখন মণ্ডপে স্থাপন করা হয় এবং ভক্তরা সেখানে পূজা দেন, তখন দীর্ঘদিনের সব পরিশ্রম ও কষ্ট সার্থক মনে হয়।
প্রতিমাশিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয় বেশ আগে। কাঠ ও বাঁশের কাঠামো তৈরি, খড় দিয়ে অবয়ব দাঁড় করানো, মাটির প্রলেপ, শুকানো এবং এরপর রং ও সাজসজ্জা—প্রতিটি ধাপেই সময় ও শ্রম দিতে হয়। শেষ সময়ে এসে কাজের চাপ আরও বেড়ে যায়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা হস্তান্তর করতে অনেক শিল্পীকেই রাত পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে।
এদিকে প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি পূজামণ্ডপগুলোতেও চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রতিমা, সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা ও অন্যান্য খাতে এবার ব্যয় বেড়েছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব উদযাপনের পাশাপাশি সরকারি সহায়তা আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
শ্রীমতী বালা রানী ও সুজন দাসসহ কয়েকজন বলেন, পূজার আয়োজন প্রতিবছরই ব্যয়বহুল হচ্ছে। সরকারি সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি মণ্ডপে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে তারা নির্বিঘ্নে দুর্গোৎসব উদযাপন করতে পারবেন।
দুর্গাপূজা ঘিরে নিরাপত্তা প্রস্তুতিও জোরদার করেছে প্রশাসন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জেলার পূজামণ্ডপগুলোতে কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে। প্রতিটি পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী টহল ও নজরদারি বাড়ানো হবে।
ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো. জুবায়ের বলেন, দুর্গাপূজাকে ঘিরে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসন তৎপর রয়েছে।
সব মিলিয়ে জামালপুরে এখন উৎসবের অপেক্ষা। একদিকে প্রতিমাশিল্পীদের তুলির শেষ আঁচড়, অন্যদিকে মণ্ডপ সাজাতে আয়োজকদের ব্যস্ততা। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রস্তুত প্রশাসনও। সব প্রস্তুতি শেষে ঢাকের বোল, কাঁসর-ঘণ্টা ও শঙ্খধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠবে পূজামণ্ডপ। দেবীর আগমনের অপেক্ষায় এখন জামালপুরের সাত উপজেলার ২২৭টি পূজামণ্ডপ।
পড়ুন: কম আয় ও বেকারত্বে অটোরিকশায় ভিড়, বেপরোয়া চলাচলে বাড়ছে দুর্ভোগ


