মাইক্রোসফটসহ ৮ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের গ্রিনকার্ড স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি কর্মীদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় নতুন বাধা তৈরি করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন নাগরিকদের চাকরি ও মজুরি সুরক্ষার যুক্তিতে আটটি বড় প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী শ্রম সার্টিফিকেশন (পিইআরএম) কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। গ্রিন কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এই ধাপে নিষেধাজ্ঞার ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন আবেদন জমা দিতে পারবে না, একই সঙ্গে আগে জমা দেওয়া আবেদনগুলোর প্রক্রিয়াও বন্ধ থাকবে।

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অ্যাডোবি, কগনিজেন্ট, এইচসিএল ও ক্যাপজেমিনির মতো কোম্পানি রয়েছে। বড় প্রযুক্তি ও আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের জন্য স্পন্সর করতে সাধারণত পিইআরএম কর্মসূচি ব্যবহার করে। মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠান ভিসাব্যবস্থার অপব্যবহার করে স্থানীয় কর্মীদের চাকরির সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে।

বৃহস্পতিবার এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন মার্কিন শ্রমসচিব কিথ সান্ডারলিং। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং অ্যান্টি-ফ্রড টাস্ক ফোর্সের প্রধান।

শ্রম দপ্তরের ঘোষণা অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত আটটি প্রতিষ্ঠানের নতুন কোনো পিইআরএম আবেদন গ্রহণ করা হবে না। আগে জমা দেওয়া আবেদনও আর প্রক্রিয়াজাত করা হবে না। সান্ডারলিংয়ের দাবি, ২০০৯ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় ৩০ লাখ বিদেশি কর্মী নিয়োগের আবেদন করেছে। একই সময়ে তারা ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি এইচ-১বি ভিসার অনুমোদন এবং ১ লাখের বেশি স্থায়ী শ্রম সার্টিফিকেশন পেয়েছে।

তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সব ধরনের কাজের ভিসা বাতিল হচ্ছে না। মূলত বিদেশি কর্মীদের গ্রিন কার্ডের জন্য প্রয়োজনীয় স্থায়ী শ্রম সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ায় তাদের আবেদন স্থগিত করা হয়েছে।

পিইআরএম কী, কেন গুরুত্বপূর্ণ

পার্মানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন বা পিইআরএম এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে নিয়োগকর্তারা বিদেশি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি বা গ্রিন কার্ড পাওয়ার জন্য স্পন্সর করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে সাধারণত নিয়োগকর্তাকে প্রমাণ করতে হয়, সংশ্লিষ্ট পদে কাজ করার মতো পর্যাপ্ত যোগ্য মার্কিন কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না।

আগের কাগজভিত্তিক ‘এলিয়েন এমপ্লয়মেন্ট সার্টিফিকেশন’ কর্মসূচির দীর্ঘ প্রক্রিয়াকরণের সময় কমাতে ২০০৫ সালে পিইআরএম চালু করা হয়। এর আওতায় মার্কিন শ্রম বিভাগ নিয়োগকর্তাদের স্থায়ী বসবাসের জন্য বিদেশি কর্মীদের স্পন্সর করার সুযোগ দেয়। কোনো ব্যক্তিগত কর্মী সরাসরি এ প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেন না; যোগ্য নিয়োগকর্তাকেই উদ্যোগ নিতে হয়।

এই প্রক্রিয়ায় শ্রম বিভাগকে ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেসের কাছে সার্টিফাই করতে হয় যে সংশ্লিষ্ট চাকরির জন্য পর্যাপ্ত যোগ্য ও দক্ষ মার্কিন কর্মী নেই। একই সঙ্গে বিদেশি কর্মী নিয়োগের কারণে একই ধরনের কাজে নিয়োজিত মার্কিন কর্মীদের মজুরি ও কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, সেটিও নিশ্চিত করতে হয়।

এইচ-১বি ভিসার সঙ্গে পিইআরএমের পার্থক্য রয়েছে। এইচ-১বি একটি অস্থায়ী কর্মভিসা, যার মাধ্যমে দক্ষ বিদেশি কর্মীরা সাধারণত সর্বোচ্চ ছয় বছর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করতে পারেন। অন্যদিকে, পিইআরএম হলো স্থায়ী শ্রম সার্টিফিকেশন পাওয়ার প্রক্রিয়া, যা গ্রিন কার্ডের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ফলে পিইআরএম কার্যক্রম স্থগিত হওয়া মানেই কোনো কর্মীর এইচ-১বি ভিসার বৈধতা বাতিল হয়ে যাওয়া নয়। তবে এর ফলে স্থায়ীভাবে বসবাসের আবেদনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্য কর্মীদের স্পন্সর করার সুযোগ কোম্পানিগুলোর জন্য সীমিত হতে পারে।

অনিশ্চয়তায় ভারতীয় প্রযুক্তি কর্মীরা

নতুন সিদ্ধান্তে হাজার হাজার ভারতীয় প্রযুক্তি পেশাজীবী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, তাদের অনেকে এইচ-১বি ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে কাজ শুরু করার পর স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য নিয়োগকর্তার স্পন্সর করা গ্রিন কার্ডের ওপর নির্ভর করেন।

মার্কিন সেন্সাসের তথ্যভিত্তিক সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা ৫২ লাখের বেশি।

পিইআরএমের মাধ্যমে স্পন্সর করার সুযোগ না থাকলে বিদেশি কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে অনেককে দীর্ঘ সময় অস্থায়ী ভিসায় থাকতে হতে পারে। একই সঙ্গে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ বিদেশি কর্মীদের চাকরি গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় কোম্পানিগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক দক্ষ কর্মী নিয়োগও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

তবে পিইআরএমের বাইরে নিজ উদ্যোগে গ্রিন কার্ডের আবেদন করার কিছু পথ রয়েছে। এর মধ্যে অসাধারণ প্রতিভাধর ব্যক্তিদের জন্য ইবি-১এ এবং ইবি-২ ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট ওয়েভার উল্লেখযোগ্য। কিন্তু আবেদন জমে থাকা এবং বরাদ্দের সীমাবদ্ধতার কারণে এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতেও কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।

মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে ভ্যান্সের অভিযোগ

বিদেশি কর্মী নিয়োগের ভিসাব্যবহার নিয়ে বিশেষভাবে মাইক্রোসফটের সমালোচনা করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি এইচ-১বি ভিসাব্যবস্থার সবচেয়ে বেশি অপব্যবহার করেছে। মার্কিন কর্মীদের ছাঁটাই করে একই ধরনের পদে বিদেশি কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে তাদের জায়গায় অন্যদের বসানোর অভিযোগও তুলেছেন তিনি।

ভ্যান্সের দাবি, ২০২৫ সালে মাইক্রোসফট প্রায় ৬ হাজার মার্কিন কর্মীকে চাকরিচ্যুত করলেও একই সময়ে বিপুলসংখ্যক এইচ-১বি ভিসার অনুমোদন পেয়েছে এবং হাজার হাজার পিইআরএম আবেদন জমা দিয়েছে। তার অভিযোগ, এসব আবেদনের প্রায় ১ হাজার ছিল ছাঁটাই হওয়া মার্কিন কর্মীদের একই ধরনের পদের বিপরীতে।

মার্কিন শ্রমবাজারে বিদেশি কর্মীদের প্রভাব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এইচ-১বি ভিসায় নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের ‘বিদেশি চুক্তিবদ্ধ চাকর’ বলে উল্লেখ করেন ভ্যান্স। একই সঙ্গে এ ধরনের ভিসা ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘ভিসা মিল’ বলে আক্রমণ করেন তিনি।

ভ্যান্সের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশি কর্মী নিয়োগের আগে কোম্পানিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে সংশ্লিষ্ট পদের বিজ্ঞাপন দিয়ে স্থানীয় কর্মীদের আবেদন করার সুযোগ দিতে হয়। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান ছোট শহরের সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন প্রকাশের পর দাবি করে, যোগ্য কোনো প্রার্থী পাওয়া যায়নি। এভাবে স্থানীয় কর্মীদের বাদ দিয়ে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তার।

বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে মার্কিন কর্মীদের স্বার্থ রক্ষার ওপর জোর দিয়ে ভ্যান্স বলেন, ‘মাইক্রোসফটের প্রতি আমাদের বার্তা হলো- আপনারা একটি বিশাল আমেরিকান কোম্পানি কিন্তু আপনাদের অসাধারণ আমেরিকান কর্মীই নিয়োগ করতে হবে।’

ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, বিদেশি কর্মীদের জন্য ব্যবহৃত এসব ভিসার কারণে মার্কিন নাগরিকদের চাকরির সুযোগ কমছে। তবে কোম্পানিগুলো মার্কিন কর্মীদের সরিয়ে দিতে এবং তাদের মজুরি কমাতে পিইআরএম কর্মসূচি ব্যবহার করছে—ভ্যান্সের এমন অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ উল্লেখ করা হয়নি।

এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত দক্ষ বিদেশি কর্মীদের নতুন এইচ-১বি ভিসার আবেদনে এককালীন ১ লাখ ডলার ফি আরোপের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ফেডারেল আদালতের আদেশে সেই পদক্ষেপ অবরুদ্ধ হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধেও তদন্ত

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বিদেশি গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহৃত ভিসা কর্মসূচি নিয়েও কঠোর অবস্থান নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। জে-১ বিনিময়-ভিজিটর ভিসার মাধ্যমে বিদেশি গবেষকদের স্পন্সর করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভ্যান্স।

তার অভিযোগ, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বিদেশি গবেষক ও শিক্ষার্থীদের কাজে লাগিয়ে মার্কিন স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী এবং গবেষকদের মজুরি কমিয়ে দিচ্ছে। এ বিষয়ে হার্ভার্ড, ইয়েল ও স্ট্যানফোর্ডসহ নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো।

ভ্যান্সের মতে, দক্ষ ও মেধাবী বিদেশি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে কাজের সুযোগ দেওয়ার জন্য তৈরি ভিসাব্যবস্থাকে মার্কিন কর্মীদের মজুরি কমানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। তার দাবি, এ ধরনের চর্চা স্থানীয় কর্মীদের স্বার্থ ও জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়ে নাসকমের বক্তব্য

যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের পর ভারতের প্রযুক্তি খাতের সংগঠন নাসকম জানিয়েছে, দেশটির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো গত কয়েক বছরে এইচ-১বি ভিসার ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।

সংগঠনটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অভিবাসন এবং দক্ষ কর্মীদের আন্তর্জাতিক চলাচল দুটি আলাদা বিষয়। তাই এগুলোকে একইভাবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

নাসকমের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্পমেয়াদি দক্ষ কর্মীর ঘাটতি পূরণে দীর্ঘদিন ধরে এইচ-১বি ভিসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ভবিষ্যতেও এ কর্মসূচির প্রয়োজন থাকবে।

সংগঠনটি আরও জানিয়েছে, ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয়ভাবে কর্মী নিয়োগ বাড়িয়েছে এবং নিজেদের কর্মীবাহিনী গড়ে তুলেছে। দেশটির ফরচুন ৫০০ তালিকাভুক্ত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে বলেও দাবি করেছে নাসকম।

নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে স্থগিতাদেশ কীভাবে বাস্তবায়ন করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে মার্কিন সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর।

পড়ুন : মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের উত্তাপ, বাড়ল তেলের দাম

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন