১০ বছরের সাজার রায়ের বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে ইনুর আপিল

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কর্তৃক ঘোষিত ১০ বছরের সাজা বাতিল করে খালাসের আরজি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। বুধবার (১৪ অক্টোবর) আপিল আবেদনের বিষয়টি সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন ইনুর আইনজীবী সিফাত মাহমুদ।

বিজ্ঞাপন

এর আগে গত ৩০ জুন (মঙ্গলবার) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ইনুর বিরুদ্ধে এ রায় দেন। বেঞ্চের অন্য দুই বিচারক ছিলেন বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। আসামির বিরুদ্ধে আনীত আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের মধ্যে তিনটি অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিটিতে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে নির্দেশ অনুযায়ী তিনটি সাজা একসঙ্গে চলায় ইনুকে মোট ১০ বছর কারাভোগ করতে হবে।

জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান দমনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের সূত্রে ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’ এবং কুষ্টিয়ায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় ইনুর বিরুদ্ধে এই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল।

ইনুর আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ জানান, সাবেক এই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে বর্তমানে ৮৭টি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) একটি মামলা চলমান রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট রাজধানীর উত্তরায় অভিযান চালিয়ে ইনুকে আটক করেছিল পুলিশ। শুরুতে নিউ মার্কেট থানার এক হত্যা মামলায় এবং পরবর্তী সময়ে গত বছরের ২১ আগস্ট কুষ্টিয়ার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এছাড়া শাপলা চত্বরের হত্যাযজ্ঞ সংক্রান্ত মামলায়ও বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিচার কাজ চলছে।

মামলার প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ২৬ আগস্ট ইনু গ্রেপ্তার হওয়ার পর প্রসিকিউশনের তদন্ত দল ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ থেকে তদন্ত পরিচালনা করে এবং ১১ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দেয়। এরপর ২৫ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ ট্রাইব্যুনালে ৩৯ পৃষ্ঠার ফরমাল চার্জ ও ২০ জন সাক্ষীর তালিকার ভিত্তিতে মোট আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেশ করে। ৩ নভেম্বর অভিযোগ গঠন শেষে ওই বছরের ৩০ নভেম্বর প্রসিকিউশনের সূচনার মধ্য দিয়ে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ প্রসিকিউশনের ১০ জন সাক্ষী এবং আসামিপক্ষের ২ জন সাফাই সাক্ষী জবানবন্দি দেন।

বিচার চলাকালে ট্রাইব্যুনালে নিজের যুক্তিতর্ক ও লিখিত বক্তব্যে ইনু মামলাটিকে রাজনৈতিক আক্রোশপ্রসূত দাবি করেন। অভিযোগ গঠনের শুনানিতে কথা বলার অনুমতি নিয়ে তিনি নিজের মতামত প্রকাশ করেন, “আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমি মনে করি আল্লাহর পর বিচার নিষ্পত্তির প্রতিনিধি আপনি। আপনি ন্যায়বিচার করবেন।”

পরবর্তীতে চলতি বছরের ১১ মার্চ ট্রাইব্যুনালে ৬৪ পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্যে ইনু আনীত সব অভিযোগকে কাল্পনিক ও বানোয়াট আখ্যা দেন। আসামিপক্ষের পুনর্তদন্ত ও সাক্ষী তলবের আবেদন ট্রাইব্যুনাল খারিজ করার পর ২ এপ্রিল থেকে যুক্তিতর্ক শুরু হয়ে ৬ মে পর্যন্ত চলে, যেখানে ইনুর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী তাঁর খালাস চান। রাষ্ট্রপক্ষ ১৪ মে যুক্তিতর্ক সম্পন্ন করার পর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয় এবং ২২ জুন রায়ের দিনক্ষণ স্থির করা হয়।

ইনুর বিরুদ্ধে উত্থাপিত আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ

প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে তৎকালীন সময়ে শেখ হাসিনার শীর্ষ শরিক নেতা হিসেবে ইনুর যোগসাজশ, ফোনালাপের ট্রান্সক্রিপ্ট ও ‘জঙ্গি নাটকের কার্ড’ খেলার নির্দেশনার প্রমাণ উপস্থাপনের পাশাপাশি আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছিল:

১. উসকানিমূলক বক্তব্য: ১৮ জুলাই ২০২৪ সালে ভারতীয় গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে আন্দোলনকারীদের জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক আখ্যা দেওয়া এবং বলপ্রয়োগের উসকানি প্রদান।

২. মারণাস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত: ১৯ জুলাই গণভবনে ১৪ দলের বৈঠকে আন্দোলন দমনে ‘শুট অ্যাট সাইট’ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সহায়তা।

৩. তালিকা প্রণয়ন নির্দেশ: আন্দোলনের ছবি দেখে ছাত্র-জনতার তালিকা করে নির্যাতন চালাতে কুষ্টিয়ার এসপিকে ফোনালাপে নির্দেশ প্রদান।

৪. আকাশপথে হামলার পরিকল্পনা: আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বম্বিংয়ের পরিকল্পনা।

৫. সহিংসতায় সমর্থন: সরকারের গণমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা ও নিপীড়নকে কৌশলে সমর্থন দেওয়া।

৬. জামায়াত নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত: ১৪ দলের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তে সম্পৃক্ততা।

৭. ষড়যন্ত্রে ফোনালাপ: শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে যুক্ত থেকে আন্দোলন দমনে নানা পরিকল্পনা তৈরি।

৮. কুষ্টিয়ায় হত্যাকাণ্ডসহ সামগ্রিক সহিংসতা: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় ইউসুফ শেখ, উসামা, সুরুজ আলী, আশরাফুল ইসলাম, বাবলু ফরাজী ও আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিনসহ ছয়জনকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া এবং দেশজুড়ে ১,৪০০ হত্যা ও ২৫ হাজার আহত করার ঘটনায় প্ররোচনা।

১৯৪৬ সালের ১২ নভেম্বর জন্ম নেওয়া হাসানুল হক ইনু ১৯৭০ সালে বুয়েট থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি সম্পন্ন করেন। ১৯৭২ সালে জাসদের প্রতিষ্ঠাকালীন সহ-সভাপতি ইনু ১৯৮৬ সালে দলের সাধারণ সম্পাদক ও ২০০২ সালে সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি কুষ্টিয়া-২ আসন থেকে মহাজোটের প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য হন এবং ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে একই আসন থেকে তিনি পরাজিত হন।

পড়ুন : বিরোধী দল অংশ না নিলেও সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ থেমে থাকবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন