মানি, মোবাইল ও মোটরসাইকেল: অপরাধ রোধে এসপির সময়োপযোগী বয়ান

প্রথাগত চার দেয়ালের গণ্ডি আর প্রশাসনিক কাঠিন্য থেকে বেরিয়ে ভিন্ন রূপে দেখা গেল নেত্রকোনার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. তরিকুল ইসলামকে। সমাজের নানা স্তরে যখন মূল্যবোধের চরম সংকট, তখন তিনি বেছে নিলেন সরাসরি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর এক মোক্ষম পথ। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) জুমআ নামাজ আদায়ের প্রাক্কালে নেত্রকোনা পৌরশহরের চকপাড়া কোর্ট স্টেশন জামে মসজিদে ব্যতিক্রমী ও যুগোপযোগী বক্তব্য রাখেন তিনি।

মসজিদে তখন উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপি’র সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য বীরমুক্তিযোদ্ধা মো. আশরাফ উদ্দিন খান, নেত্রকোনা মডেল থানার ওসি আবুল খায়েরসহ নানা শ্রেণি-পেশার বিপুল সংখ্যক মুসল্লি। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তারা সাধারণত ছকে বাঁধা বক্তব্য দেন। এদিন পুলিশ সুপারের কণ্ঠে ছিল একজন অভিভাবক, একজন সমাজ সংস্কারক এবং একজন সংবেদনশীল মানুষের আকুতি। তার ‘সফট অ্যাপ্রোচ’ বা নম্র যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করা ব্যাধিগুলো নিয়ে যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তা প্রতিটি মানুষের জন্য সতর্কবার্তা।

তরুণ প্রজন্মের অবক্ষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এসপি তরিকুল ইসলাম অভিভাবকদের প্রতি কঠোর অথচ যৌক্তিক বার্তা দেন। তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের ক্ষেত্রে ‘তিনটি এম (M)’-এর ব্যবহার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। তিনটি ‘এম’ হলো- মানি (Money/টাকা), মোবাইল (Mobile) এবং মোটরসাইকেল (Motorcycle)।

তিনি বলেন, “অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে এই তিনটি জিনিস দিতে গেলে একটু চিন্তাভাবনা করবেন। আমরাও চাই আপনার সন্তান আদরে থাকুক, সেই সন্তান মোটরসাইকেল নিয়ে কোথায় যায়, কার সাথে মেশে, সন্ধ্যার পর বাসায় ফেরে কি না- এই বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে”। অভিভাবকদের নিজেদের মোবাইল ফোনের স্ক্রলিং কমিয়ে সন্তানদের জন্য সময় বরাদ্দ করারও তাগিদ দেন তিনি।

মাদকের বৈশ্বিক সমস্যার কথা উল্লেখ করার পাশাপাশি তিনি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাধি ‘অনলাইন জুয়া’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, বর্তমানে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা বাদ দিয়ে স্মার্টফোনের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছে।

শিউরে ওঠার মতো তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, “কয়েকদিন আগে শহর থেকে একটি ছেলেকে আমরা ধরেছি, যে মাত্র তিন মাসে অনলাইন জুয়ায় ১৩ লাখ টাকা খুইয়েছে!”। তিনি বলেন, বিভিন্ন বেটিং সাইট শুরুতে কিছু টাকা ফ্রি দিয়ে তরুণদের ফাঁদে ফেলে, এরপর তারা সর্বস্বান্ত হয়।

প্রযুক্তির অপব্যবহার কীভাবে মেয়েদের জীবন বিপন্ন করছে, সে বিষয়েও তিনি কথা বলেন। তিনি একটি ঘটনার উদাহরণ দেন, যেখানে এক মেয়ে তাকে ফোন করে জানায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে তার ছবি বিকৃত করে তাকে ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে।

পুলিশ সুপার মেয়েটিকে আশ্বস্ত করে থানায় জিডি করার পরামর্শ দেন। এই প্রসঙ্গে তিনি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করে বলেন, “ইসলামে নারীর মর্যাদা অনেক, আমরা নারীকে পুতুল বানিয়ে রাখছি। মায়ের কী সম্মান, বোনের কী সম্মান- তা আমরা ভুলে যাচ্ছি”।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক দিক নিয়েও সতর্ক করেন পুলিশ সুপার। ফেসবুকের লাইক, কমেন্ট ও শেয়ারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “রাষ্ট্রবিরোধী, সমাজবিরোধী বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে এমন কোনো পোস্টে আমরা সম্পৃক্ত হবো না”।

কেউ যদি উসকানিমূলক পোস্ট দেয়, তবে আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে সরাসরি পুলিশকে জানানোর অনুরোধ করেন তিনি। তিনি বলেন, “যার যার ধর্ম সে পালন করবে। ধর্মের ব্যাপারে আমরা কখনোই খারাপ মন্তব্য করব না”।

বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল মানুষের সৃষ্টিতত্ত্ব ও নৈতিকতার দর্শন। তিনি মুসল্লিদের স্মরণ করিয়ে দেন, মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। ইভটিজিং, চাঁদাবাজি বা অন্যের ক্ষতি করার জন্য মানুষকে সৃষ্টি করা হয়নি। মৃত্যুর পর পৃথিবীতে কেবল মানুষের ভালো কাজের ‘ফুটপ্রিন্ট’ বা পদচিহ্নই থেকে যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সবশেষে তিনি সমাজে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ বাড়াতে সঠিক উচ্চারণে সালাম বিনিময়ের ওপর জোর দেন। বিকৃত উচ্চারণে সালাম না দিয়ে পূর্ণাঙ্গ সালাম (আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ) দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যা মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করে।

নেত্রকোনার পুলিশ সুপারের ব্যতিক্রমী জনসংযোগ শুধু একটি রুটিন বক্তব্য ছিল না; এটি ছিল দিকভ্রান্ত সমাজকে সঠিক পথে ফেরানোর আন্তরিক ব্লু-প্রিন্ট। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের এখন সময় এসেছে এই বার্তাগুলোকে অনুধাবন করে নিজ নিজ পরিবারে এর চর্চা শুরু করার।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : শ্রীপুরে সাউন্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণে একজনের হাতের আঙ্গুল বিচ্ছিন্ন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন