শরতের শুভ্র কাশফুল আর দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের বাদ্য জানান দিচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা। উৎসবের আনন্দ ছুঁয়ে যায় প্রতিটি বাঙালির হৃদয়। সমাজের যে অংশটির কাছে দু’বেলা অন্ন জোগাড় করাই প্রতিদিনের সংগ্রাম, উৎসবের নতুন পোশাক তাদের কাছে শুধুই যেন এক বিলাসী স্বপ্ন। সেই সুবিধাবঞ্চিত, প্রান্তিক মানুষদের মলিন মুখে একটুখানি হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলতে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে রচিত হলো মানবিকতার অনন্য এক দৃষ্টান্ত।
‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’- বাঙালির এই শাশ্বত ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ৫১ জন অসহায় ও দুস্থ মানুষের মাঝে নতুন বস্ত্র বিতরণ করেছে দুর্গাপুরের শ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রম ও স্বামী বিবেকানন্দ অনাথ আশ্রম।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার কুল্লাগড়ায় অবস্থিত আশ্রম চত্বরে অনাড়ম্বর অথচ স্নিগ্ধ আয়োজনের মধ্য দিয়ে বস্ত্র তুলে দেওয়া হয়। তবে উৎসবের আনন্দকে সমাজের একেবারে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সাথে ভাগ করে নেওয়ার দৃশ্যগুলো সত্যিই হৃদয়ে আলাদা প্রশান্তি এনে দেয়। প্রথাগত সংবাদের কাঠামোর বাইরে গিয়ে তাই মানবিক গল্পটি সমাজের প্রতিটি মানুষের জানা প্রয়োজন।
শুক্রবার দুপুরে কুল্লাগড়ার আশ্রম প্রাঙ্গণটি পরিণত হয়েছিল অন্যরকম মিলনমেলায়। সেখানে দাতা ও গ্রহীতার কোনো ভেদাভেদ ছিল না; ছিল কেবলই মানুষে মানুষে ভালোবাসার আদান-প্রদান। নতুন পোশাক হাতে পেয়ে দুস্থ মানুষগুলোর চোখে-মুখে যে কৃতজ্ঞতা ও আনন্দের ঝিলিক দেখা গেছে, তা যেন দুর্গাপূজার প্রকৃত উৎসবের রংকেই আরও রাঙিয়ে তুলেছে।
মহতী এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন সমাজহিতৈষী ও আশ্রমের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ। উপস্থিত ছিলেন রামকৃষ্ণ আশ্রমের সভাপতি অ্যাডভোকেট মানেশ সাহা, সাধারণ সম্পাদক প্রভাত সাহা, স্বামী কাশিকানন্দজি মহারাজ এবং আশ্রমের সক্রিয় সদস্য দীপক সাহা ও বিশ্বজিৎ সাহা প্রমুখ। তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো আয়োজনটি পারিবারিক আবহে রূপ নেয়।
বস্ত্র বিতরণকালে আশ্রমের সভাপতি অ্যাডভোকেট মানেশ সাহা অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে নিজেদের উদ্যোগের পেছনের তাগিদ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “শারদীয় দুর্গাপূজার আনন্দ কেবল নিজেদের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখলে উৎসবের প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। আনন্দ সমাজের সকল স্তরের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া এবং অসহায় ও দুস্থ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোই আমাদের মূল লক্ষ্য। সেই সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই প্রতিবছরের মতো এবারও আশ্রমের পক্ষ থেকে আমরা বস্ত্র বিতরণ কর্মসূচির আয়োজন করেছি।”
তাঁর এই কথায় যেন স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে শ্রী রামকৃষ্ণের সেই অমোঘ বাণী- ‘জীবে দয়া নয়, শিবজ্ঞানে জীবসেবা’। উৎসব মানেই যে কেবল নিজের জন্য নতুন পোশাক আর আড়ম্বর নয়, বরং উৎসব মানে যে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোকে ভালোবেসে আপন করে নেওয়া- দুর্গাপুরের কুল্লাগড়া রামকৃষ্ণ আশ্রম প্রাঙ্গণের আয়োজন সমাজকে সেই বার্তাই দিয়ে গেল।
বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় যখন মানুষের মাঝে আত্মকেন্দ্রিকতা বাড়ছে, তখন নেত্রকোনার অঞ্চলে এমন মানবিক উদ্যোগ নিশ্চিতভাবেই সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য দারুণ অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এমন ছোট ছোট আন্তরিক উদ্যোগগুলোর মধ্য দিয়েই একদিন হয়তো ‘উৎসব সবার’ কথাটি তার আক্ষরিক অর্থেই পূর্ণতা পাবে। দুর্গাপুরের এই উদ্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়- মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হওয়ার চেয়ে বড় কোনো ধর্ম নেই, আর সবার মুখে হাসি ফোটানোর চেয়ে বড় কোনো উৎসব নেই।
পড়ুন : ৫ বছর পর টাঙ্গাইলে প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগ শুরু


