বিশ্ববাজারে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পর কমতে শুরু করেছে অপরিশোধিত তেল পরিবহনে ব্যবহৃত বিশালাকৃতির জাহাজ বা সুপারট্যাংকারের ভাড়া। মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজে নতুন করে হামলা, তেল রপ্তানি কমে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সম্ভাবনায় আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে তেল পরিবহনের বাজারে এ পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। তবে ভাড়া কমলেও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাল্টিক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, ওমান উপসাগর থেকে চীনে অপরিশোধিত তেল পরিবহনে ব্যবহৃত অতি বৃহৎ তেলবাহী জাহাজের (ভিএলসিসি) ভাড়ার সূচক কমে ৭৭৬-এ নেমেছে। এর আগের সপ্তাহে সূচকটি ৮৪১-এ উঠেছিল, যা চলতি বছরের শুরুতে সূচক চালুর পর সর্বোচ্চ পর্যায়।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলবাহী জাহাজের ভাড়া ধারাবাহিকভাবে বেড়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও নিরাপত্তাঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে তেল পরিবহনে ব্যয় বেড়ে যায়। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় পরিবহন বাজারে চাপ বাড়ে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজে হামলার পর ওই অঞ্চলে পরিবহন ব্যয় আরও বেড়েছে। এর প্রভাবে তেল রপ্তানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় ওমান উপসাগর থেকে চীনগামী রুটে ট্যাংকারের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। ফলে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পর এ রুটে জাহাজভাড়ার সূচক নিম্নমুখী হয়েছে।
কে-প্লারের বিশ্লেষক ম্যাথিউ রাইট বলেন, সাম্প্রতিক হামলার পর ওমান উপসাগরীয় রুটে জাহাজভাড়া কমেছে। মধ্যপ্রাচ্য উপসাগরীয় অঞ্চলে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তেল রপ্তানি কমেছে, যা ওই রুটে ট্যাংকারের চাহিদায় প্রভাব ফেলেছে।
সুপারট্যাংকারের ভাড়া কমার আরেকটি কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সম্ভাবনাকে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকেরা। তেল পরিবহনে ব্যবহৃত নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন কিছু জাহাজের ওপর বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবহারযোগ্য ট্যাংকারের সংখ্যা বাড়তে পারে। এতে জাহাজের সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়ে ভাড়ার ওপর নিম্নমুখী চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্পার্টা কমোডিটিজের বিশ্লেষক মাইকেল রায়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর কিছু ট্যাংকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা নিয়ে মন্তব্যের পর জাহাজভাড়া কমেছে।
শ্যাডো ফ্লিট বলতে সাধারণত এমন জাহাজের বহরকে বোঝানো হয়, যেগুলো নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশ থেকে তেল পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। এসব জাহাজের অনেকগুলো প্রচলিত আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির বাইরে পরিচালিত হয় বলে পরিচিত।
জাহাজভাড়া কমতে শুরু করলেও বিশ্ব জ্বালানি পরিবহন বাজারে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব রয়ে গেছে। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ট্যাংকারের চাহিদা ও পরিবহন ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পশ্চিম আফ্রিকা থেকে এশিয়ায় অপরিশোধিত তেল পরিবহনের মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রুটেও চলতি সপ্তাহে জাহাজভাড়া রেকর্ড উচ্চতা থেকে কমেছে। অর্থাৎ ভাড়ার নিম্নমুখী প্রবণতা শুধু ওমান উপসাগর-চীন রুটেই সীমাবদ্ধ নয়।
বিশ্ববাজারে তেল পরিবহনের ব্যয় দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে তার প্রভাব জ্বালানি ও পণ্যবাজারে পড়তে পারে। পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে তেল আমদানিকারক দেশ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরও পড়তে পারে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে, জাহাজভাড়া কমলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের পরিবহন ব্যয়ে কিছুটা স্বস্তি আসার সুযোগ তৈরি হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ভাড়ার স্থায়ী নিম্নমুখী প্রবণতা নিশ্চিত নয়। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, তেল রপ্তানির পরিমাণ, ট্যাংকারের প্রাপ্যতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে আগামী দিনে আন্তর্জাতিক জাহাজ পরিবহন বাজারের গতিপথ।
পড়ুন:টানা ৫ দিন ছুটির আগে আজ শনিবার ব্যাংক খোলা
ইমি/


