তাঁবু রপ্তানিতে বিশ্বে দ্বিতীয় বাংলাদেশ, আয় ২৩ কোটি ডলারের বেশি

তৈরি পোশাকের বাইরে বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে তাঁবু ও আউটডোর সরঞ্জাম শিল্প। বিশ্ববাজারে ক্যাম্পিং, অ্যাডভেঞ্চার ও আউটডোর বিনোদনের চাহিদা বাড়ায় এ খাতে বাংলাদেশের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা সম্প্রসারিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশে তৈরি তাঁবু ও ক্যাম্পিং সরঞ্জামের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগও আসছে। তবে কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা, উৎপাদন ব্যয় ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এ শিল্পের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

জাতিসংঘের বাণিজ্য পরিসংখ্যান সংস্থা কমট্রেড ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে তাঁবু রপ্তানিতে চীনের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এ খাতে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের তুলনায়ও দেশটির অবস্থান এগিয়ে। ফলে প্রচলিত তৈরি পোশাকের পাশাপাশি তাঁবু ও আউটডোর সরঞ্জাম রপ্তানি দেশের পণ্য বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ তাঁবু ও ক্যাম্পিং সামগ্রী রপ্তানি করে প্রায় ২৩৭ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ২০ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ডলার। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাতে রপ্তানি আয় ছিল ৪২১ মিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৭৬ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২২২ মিলিয়ন ডলার। করোনা মহামারির সময় বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাতটি আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।

তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের তাঁবু রপ্তানির প্রায় ৯৩ শতাংশই সিনথেটিক ফাইবারের তৈরি তাঁবু। গত অর্থবছরে এ ধরনের তাঁবু রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ২২০ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার। বাকি রপ্তানির মধ্যে রয়েছে ক্যাম্পিং সরঞ্জাম, তারপলিন, ছাউনি, টেক্সটাইলের তাঁবু ও তাঁবুর পাল-জাতীয় পণ্য।

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তাঁবুর সবচেয়ে বড় গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। গত অর্থবছরে দেশটিতে তাঁবু ও আউটডোর সরঞ্জাম রপ্তানি হয়েছে ৮৭ দশমিক ৫২ মিলিয়ন ডলারের, যা মোট রপ্তানির ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ। এ ছাড়া ফ্রান্সে ২৮ দশমিক ৭৩ মিলিয়ন, কানাডায় ১৯ দশমিক ৯৯ মিলিয়ন, স্পেনে ১৯ দশমিক ১৭ মিলিয়ন এবং যুক্তরাজ্যে ১৮ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ৪৯টি দেশে তাঁবু ও ক্যাম্পিং সরঞ্জাম রপ্তানি করেছে।

তাঁবু ও আউটডোর সরঞ্জাম শিল্পে রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগও সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) অধীনে দেশের ইপিজেডগুলোতে বর্তমানে এ খাতের ১৪টি কারখানা উৎপাদন চালাচ্ছে। গত দুই বছরে এ খাতে প্রায় আটটি নতুন বিনিয়োগ চুক্তি হয়েছে।

গত ২০ মে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস ও হংকংভিত্তিক সানশাইন আউটডোর বিডি কোং লিমিটেড তাঁবু ও ক্যাম্পিং পণ্য উৎপাদনের কারখানা স্থাপনে দেড় কোটি ডলার বিনিয়োগের জন্য জমি ইজারা চুক্তি করে। দক্ষিণ কোরিয়ার পিএইচ ক্রিয়েটিভ বিডি লিমিটেড তাঁবুর ফ্রেম, ফাইবারগ্লাস পোল, স্লিপিং ব্যাগ ও ক্যাম্পিং চেয়ার উৎপাদনে ২ কোটি ৪০ লাখ ডলার বিনিয়োগের চুক্তি করেছে। অন্যদিকে হংকং-চীনভিত্তিক গ্রিন পিউর হাউসওয়্যার কোম্পানি গ্রিনহাউস ও হাইড্রোপনিকস টেন্ট উৎপাদনে প্রায় ৩ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

এ ছাড়া ক্যাম্পভ্যালি গ্লোবাল লিমিটেড প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার বিনিয়োগে নতুন কারখানা স্থাপন করছে। তাইওয়ান-সমর্থিত ন্যাটওয়ে আউটডোর প্রায় ৩ কোটি ৩ লাখ ডলার এবং কুইন্ডা আউটডোর ১ কোটি ২০ লাখ ডলার বিনিয়োগে কারখানা স্থাপন করেছে। এসব কারখানায় তাঁবুর পাশাপাশি স্লিপিং ব্যাগসহ বিভিন্ন ক্যাম্পিং পণ্য তৈরি হচ্ছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার মালিকানাধীন এইচকেডি ইন্টারন্যাশনালও এ খাতের অন্যতম বড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠানটির ১১টি উৎপাদন লাইন রয়েছে। মাসে প্রায় তিন লাখ তাঁবু উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের ৩৩টি দেশে পণ্য রপ্তানি করে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত প্রায় ১০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সম্প্রতি আরও সাড়ে তিন কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

চট্টগ্রামের ইপিজেডগুলোতে তাঁবু, ক্যাম্পিং ফার্নিচার, ক্যানোপি, স্লিপিং ব্যাগ ও বিভিন্ন আউটডোর সরঞ্জাম উৎপাদন করছে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ক্যাম্পভ্যালি গ্লোবাল লিমিটেডের কর্ণফুলী ইপিজেডে তিনটি কারখানা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক রপ্তানি আয় ১২ কোটি ডলারের বেশি। চাহিদা বাড়ায় মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার বিনিয়োগে নতুন কারখানা স্থাপন করছে তারা। সেখানে বছরে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ পিস তাঁবু, ব্যাগ, ব্যাকপ্যাক, ক্যাম্পিং চেয়ার, ফার্নিচার, লাগেজ, স্লিপিং ব্যাগ ও গেজেবো উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

ক্যাম্পভ্যালি গ্লোবালের প্রধান নির্বাহী হং উ লি জানান, বাংলাদেশের বাজার তাদের প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগের শুরু থেকেই তারা উল্লেখযোগ্য সুযোগ পেয়েছেন, যা বৈশ্বিক ব্যবসা সম্প্রসারণে ভূমিকা রেখেছে। বেপজার সহযোগিতাও তারা অব্যাহতভাবে পাচ্ছেন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি মূলত ইনস্ট্যান্ট তাঁবু ও প্লাস্টিকের মোল্ড তৈরি করে এবং যুক্তরাষ্ট্রে বেশি পণ্য রপ্তানি করে। বড় বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করায় দেশটি তাঁবু প্রস্তুতকারকদের কাছে আকর্ষণীয় উৎপাদনকেন্দ্র হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে কর্ণফুলী ইপিজেডের অফমা ক্যাম্প লিমিটেড হ্যামক, স্লিপিং ব্যাগ, বালিশ ও বিভিন্ন আউটডোর পণ্য তৈরি করে। বিশ্বের ২১টি দেশে পণ্য রপ্তানি করা প্রতিষ্ঠানটি গত অর্থবছরে ৪ কোটি ২৫ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। ফরাসি ক্রীড়া ও আউটডোর পণ্যের খুচরা বিক্রেতা ডিক্যাথলন প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম বড় ক্রেতা।

দক্ষিণ কোরিয়ার মালিকানাধীন পার্ক বাংলাদেশ ট্রাভেল ব্যাগ, ব্যাকপ্যাক, নারীদের ব্যাগ ও সার্ফিং ব্যাগসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করে। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে প্রায় ছয় লাখ ব্যাগ তৈরি করছে। সর্বশেষ অর্থবছরে তাদের রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার। বর্তমানে প্রায় পাঁচ হাজার কর্মী প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করছেন। উৎপাদিত ব্যাগের প্রায় ৮০ শতাংশ নেদারল্যান্ডসে রপ্তানি করা হয়, সেখান থেকে ইউরোপের বিভিন্ন বাজারে এসব পণ্য বিতরণ করা হয়।

কর্ণফুলী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক বলেন, দেশের ইপিজেডগুলো শুধু তৈরি পোশাক উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নেই; বরং সাইকেল, ব্যাগ, ফার্নিচার, তাঁবু, ক্যাম্পিং সরঞ্জাম, সেফটি শু ও ফ্যাশন শুর মতো বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে শিল্পের বৈচিত্র্য বাড়াচ্ছে। এতে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে নতুন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে।

সম্ভাবনা বাড়লেও তাঁবু ও আউটডোর সরঞ্জাম শিল্পের প্রধান দুর্বলতা কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা। পলিয়েস্টার ও নাইলন ফেব্রিক, পিইউ ও সিলিকন কোটিং, পলিয়েস্টার মেশ, দড়ি, ফ্রেম, পোল ও বিভিন্ন ফিটিংসের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হয়।

ক্যাম্পভ্যালির বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক কামার উল হক জানান, এ শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ দেশে উৎপাদিত হয়। বাকি ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। স্থানীয়ভাবে এসব কাঁচামাল উৎপাদন করা গেলে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং দ্রুত বেশি পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব হবে। তিনি আরও জানান, দেশে কাঁচামাল উৎপাদনের কিছু উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। কুমিল্লায় এ ধরনের একটি কারখানা স্থাপনের কাজ চলছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিশেষায়িত ফেব্রিক ও আনুষঙ্গিক উপকরণের স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এ শিল্পের বিকাশ আরও ত্বরান্বিত হবে। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর টেক্সটাইল ও আউটডোর পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। যথাযথ নীতি সহায়তা, দক্ষ জনবল ও কাঁচামালের স্থানীয় সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে তাঁবু ও ক্যাম্পিং সরঞ্জাম শিল্প ভবিষ্যতে রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হতে পারে।

পড়ুন:রংপুরের পথে প্রধানমন্ত্রী 

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন