গ্রামের শান্ত স্নিগ্ধ সকালটি মুহূর্তেই রূপ নিয়েছিল রণক্ষেত্রে। নিজের পৈতৃক জমির সীমানা নির্ধারণ বা ‘আইল’ বাঁধতে গিয়ে অতর্কিত হামলার শিকার হতে হলো একটি নিরীহ পরিবারকে। কেবল লাঠিসোঁটা নয়, দা, কুড়াল আর বর্শার মতো দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে রক্তাক্ত হয়েছেন বয়োবৃদ্ধ থেকে শুরু করে নারীরাও।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে নেত্রকোনা সদর উপজেলার চল্লিশা ইউনিয়নের মই জাউসি গ্রামে ঘটে যাওয়া ঘটনা যেন সমাজের বুকে এক গভীর ক্ষত। জমিজমার বিরোধ কীভাবে পারিবারিক শান্তি কেড়ে নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের জন্ম দেয়, এটি তারই এক করুণ দৃষ্টান্ত।
স্থানীয় ও আহতদের সূত্রে জানা যায়, মই জাউসি গ্রামের পৈতৃক জমি নিয়ে মৃত মহর আলীর পরিবারের সঙ্গে একই এলাকার জলিল, ছাত্তার, ইসলাম উদ্দিন ও কছুম উদ্দিনদের দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছিল। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জমির বিআরএস এবং আরওআর রেকর্ড সম্পূর্ণ তাদের পক্ষে থাকা সত্ত্বেও প্রতিপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে তা জবরদখলের পাঁয়তারা করে আসছিল। এমনকি আদালতে এ নিয়ে মামলাও চলমান।
মঙ্গলবার সকালে মৃত আবুল হোসেনের ছেলে মো. এরশাদ (৫০), মৃত মহর আলীর ছেলে জহুর আলী (৬৫) ও তাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা জমিতে আইল বাঁধতে যান। এ সময় প্রতিপক্ষের লোকজন আমতলা গ্রামের ‘রতন’ নামক এক প্রভাবশালীর নেতৃত্বে ১৫-২০ জন বহিরাগত ভাড়াটে সন্ত্রাসী নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন আহতরা। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও হামলায় আহত নার্গিস আক্তার (৩৫) কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, “আমরা শুধু জমির আইল বাঁধতে গিয়েছিলাম। ওরা দা, কুড়াল আর লাঠি নিয়ে এসে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমাদের কোনো প্রস্তুতি ছিল না।”
আহত জহুর আলীর ছেলে মো. রুবেল মিয়া (২৫) বলেন, “জমির বৈধ কোনো কাগজপত্র তাদের কাছে নেই। তারা আমতলার রতন নামের এক দালালের মাধ্যমে ভাড়াটে লোক এনে আমাদের হত্যার উদ্দেশ্যে এই হামলা চালিয়েছে।”
আহত বৃদ্ধা বেগম (৬৫) জানান, তারা গত তিন বছর ধরে এই জমি চাষাবাদ করে আসছিলেন। হঠাৎ করেই বহিরাগতদের নিয়ে এসে তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। এর আগে জমির ধানে বিষ প্রয়োগ করে ফসল নষ্ট করার মতো ঘৃণ্য কাজেরও অভিযোগ তোলেন আহত এরশাদ।
আহতদের তালিকা ও বর্তমান অবস্থাহামলায় গুরুতর আহত অবস্থায় আটজনকে উদ্ধার করে নেত্রকোনা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
আহতরা হলেন- মো. এরশাদ (৫০), জহুর আলী (৬৫), মো. রুবেল মিয়া (২৫), মো. লাল মিয়া (৮০), বিলকিস বেগম (৪০), নার্গিস আক্তার (৩৫), বেগম (৬৫), ঢাকা থেকে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসা সুমি (২৫)। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহতদের মধ্যে চারজনের অবস্থা তুলনামূলক বেশি আশঙ্কাজনক, যাদের মধ্যে নারী ও বয়োবৃদ্ধ রয়েছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্তদের মধ্যে প্রভাবশালী রতনের মোবালে নাম্বারের একধিকবার ফোন দেওয়া হলে সংযোগটি বন্ধ পাওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
নেত্রকোনা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের বলেন, “মই জাউসি গ্রামে সংঘর্ষের খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত রয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ আমরা পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
জমি নিয়ে বিরোধ আমাদের সমাজে নতুন কিছু নয়। আইনি পথে না হেঁটে গায়ের জোরে, ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরানোর প্রবণতা সুস্থ সমাজের পরিচায়ক হতে পারে না। মই জাউসি গ্রামের এ ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, জমির মোহ মানুষকে কতটা হিংস্র করে তুলতে পারে। এখন স্থানীয় সচেতন মহল এবং আহতদের পরিবারের একটাই দাবি- সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন নির্মমতার শিকার হতে না হয়।
পড়ুন : মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধু ফাদার রিগনের মোংলায় নবম মৃত্যুবার্ষিকী পালন


