ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ১২%

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত এ বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় প্রায় ১৫৮ কোটি ইউরো কমে ১ হাজার ১৯২ কোটি ইউরোতে নেমে এসেছে। গত বছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ১ হাজার ৩৫০ কোটি ইউরো। রপ্তানির পরিমাণ কমার পাশাপাশি পোশাকের গড় দাম কমে যাওয়ায় আয় হ্রাসের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের সংকলিত এক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু বাংলাদেশ নয়, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বিশ্ববাজার থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামগ্রিক পোশাক আমদানিও কমেছে। এ সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে ইইউর পোশাক আমদানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ২৯ কোটি ইউরো, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ কম।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। একই সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের গড় দাম ১৪ দশমিক ৮৭ ইউরো থেকে কমে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরো হয়েছে। অর্থাৎ, রপ্তানির পরিমাণ কমার পাশাপাশি পণ্যের গড় দাম হ্রাস পাওয়ায় রপ্তানি আয়ের ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।

রপ্তানি আয় নির্ভর করে মূলত পণ্যের পরিমাণ, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা এবং বিক্রয়মূল্যের ওপর। ফলে রপ্তানির পরিমাণ কিছুটা কমলেও যদি পণ্যের গড় দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়, তাহলে মোট আয় আরও বেশি কমতে পারে। বাংলাদেশের পোশাক খাতের ক্ষেত্রেও এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। প্রথম আট মাসের হিসাবে রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ, কিন্তু আয় কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন দেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার। এ বাজারে আয় কমে গেলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক আয়, মুনাফা এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনায় চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার সময়ে পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা রপ্তানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজারগুলোর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অন্যতম। এ অঞ্চলে পোশাক রপ্তানিতে চীনের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি বাজারে প্রতিযোগিতা ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের পতনের পেছনে রপ্তানির পরিমাণ কমে যাওয়ার পাশাপাশি পণ্যের গড় মূল্য হ্রাসের বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে ভালো দাম পাওয়া এবং উচ্চমূল্যের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করতে না পারলে রপ্তানির পরিমাণ বাড়লেও প্রত্যাশিত হারে আয় বাড়ানো কঠিন হতে পারে।

তবে আট মাসের সামগ্রিক চিত্রের মধ্যে আগস্ট মাসে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। গত বছরের আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের একই মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির মূল্য বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭২ শতাংশ। একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ কমেছে শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশ। বিপরীতে প্রতি কেজি পোশাকের গড় দাম বেড়েছে ১ দশমিক ২৯ শতাংশ।

এ পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, আগস্টে রপ্তানির পরিমাণ কমলেও গড় দাম বাড়ার কারণে রপ্তানি আয়ে সামান্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। যদিও এক মাসের এই পরিবর্তন দিয়ে পুরো বাজারের প্রবণতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না, তবু এটি কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রতিযোগী চীনের পোশাক রপ্তানি আয় চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বেড়েছে ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এ সময়ে দেশটির রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৭১ কোটি ইউরো। গত বছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ১ হাজার ৯২৬ কোটি ইউরো।

চীনের রপ্তানি আয় বৃদ্ধির বিপরীতে বাংলাদেশের আয় কমে যাওয়ায় ইউরোপের বাজারে দুই দেশের সাম্প্রতিক প্রবণতায় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এ পরিস্থিতি প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে পণ্যের গুণগত মান, উৎপাদন দক্ষতা এবং ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা বজায় রাখা প্রয়োজন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে আলোচ্য সময়ে সবচেয়ে ভালো করেছে ভিয়েতনাম। দেশটির তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়ে ৩০০ কোটি ইউরো হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে ভিয়েতনামের রপ্তানি আয় ছিল ২৮৭ কোটি ইউরো।

অন্যদিকে ইইউর বাজারে তুরস্ক, ভারত, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, মরক্কো ও কম্বোডিয়ার পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে। এসব দেশের মধ্যে ভারতের রপ্তানি আয় কমেছে ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ। অর্থাৎ, বাংলাদেশের পাশাপাশি কয়েকটি প্রতিযোগী দেশও ইউরোপের বাজারে রপ্তানি আয়ের চাপে রয়েছে। তবে চীন ও ভিয়েতনামের প্রবৃদ্ধি এ বাজারে দেশভেদে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি শিল্পসংশ্লিষ্টদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে রপ্তানির পরিমাণের পাশাপাশি পণ্যের গড় দাম কমে যাওয়ায় আয় বাড়ানোর কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা মোকাবিলায় পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, উন্নত মানের পোশাক উৎপাদন এবং উচ্চমূল্যের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং ক্রেতাদের সঙ্গে কার্যকর ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রাখাও রপ্তানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় কমার প্রধান চিত্র হলো রপ্তানির পরিমাণ ও গড় দাম—দুই ক্ষেত্রেই পতন। তবে আগস্ট মাসে আয় সামান্য বাড়ার তথ্য কিছুটা আশাব্যঞ্জক। এখন দেখার বিষয়, পরবর্তী মাসগুলোতে এ ইতিবাচক প্রবণতা বজায় থাকে কি না এবং বাংলাদেশের পোশাকশিল্প ইউরোপের বাজারে রপ্তানি আয় পুনরুদ্ধার করতে কতটা সক্ষম হয়।

পড়ুন:সাইবার নিরাপত্তাঝুঁকিতে বন্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট

ইমি/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন