আজ জাতিসংঘ দিবস

আজ ২৪ অক্টোবর, বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘জাতিসংঘ দিবস’ (United Nations Day)। ১৯৪৫ সালের এই দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব সংস্থার সনদ কার্যকরের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছিল জাতিসংঘ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডবলীলা ও ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্প্রীতি ও মানবাধিকার রক্ষার মহান বার্তা নিয়ে এই বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মটির সূচনা ঘটেছিল।

বিজ্ঞাপন

দিবসটি উপলক্ষে বিশ্বনেতৃবৃন্দ, কূটনীতিবিদ এবং সাধারণ মানুষ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক নানা সংকট মোকাবিলার সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করছেন। জাতিসংঘের সদর দপ্তর নিউইয়র্কসহ বিশ্বজুড়ে এর ১৯৩টি সদস্য দেশে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে দিনটি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির পর বিশ্বনেতারা অনুধাবন করেছিলেন যে, আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক সংস্থার প্রয়োজন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের অভিশাপ থেকে রক্ষা করবে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৫ সালের ২৬ জুন সান ফ্রান্সিসকো সম্মেলনে ৫০টি দেশের প্রতিনিধিরা জাতিসংঘ সনদে অনুস্বাক্ষর করেন।

পরবর্তীতে ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যরাষ্ট্রসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বাক্ষরকারী দেশের অনুমোদনের পর ‘জাতিসংঘ সনদে’ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাণ সঞ্চারিত হয়। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২৪ অক্টোবরকে ‘জাতিসংঘ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং ১৯৭১ সালে এটি আন্তর্জাতিক উদযাপনী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে প্রধানত চারটি মৌলিক লক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে যাচ্ছে এই সংস্থাটি:

শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান: আন্তর্জাতিক বিরোধ নিরসন ও বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে শান্তিরক্ষী বাহিনীর মাধ্যমে শান্তি ফিরিয়ে আনা।

মানবাধিকার সুরক্ষা: বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার, লিঙ্গসমতা এবং মানবাধিকার রক্ষা নিশ্চিত করা।

টেকসই উন্নয়ন: দারিদ্র্য দূরীকরণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিত করা।

আন্তর্জাতিক আইনের মর্যাদা: আন্তর্জাতিক চুক্তি রক্ষা ও বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।

বর্তমানে সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ও সচিবালয়ের মতো প্রধান অঙ্গসংস্থাগুলোর পাশাপাশি ইউনিসেফ (UNICEF), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনেস্কো (UNESCO) ও ইউএনডিপির (UNDP) মতো বিশেষায়িত সংস্থা বিশ্বজুড়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

জাতিসংঘ দিবসের এই ক্ষণে দাঁড়িয়ে বিশ্বজুড়ে দেখা দিয়েছে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ। ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘায়িত সংকট, শরণার্থী সমস্যা, খাদ্য সংকট এবং বিশ্বব্যাপী চরম জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বহুপাক্ষিক কূটনীতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে।

জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘ ঘোষিত ‘এসডিজি ২০৩০’ (Sustainable Development Goals) বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার ব্যবধান কমানো এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে একক কোনো দেশের পক্ষে বিশ্ব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়; তাই জাতিসংঘের ছায়াতলে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য।

জাতিসংঘের ইতিহাসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। এর ঠিক আট দিন পর, ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথমবারের মতো বাংলায় ভাষণ দিয়ে ইতিহাসের সৃষ্টি করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে (UN Peacekeeping) বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষ সৈন্য প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতময় এলাকায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা সাহসিকতা, নিষ্ঠা ও মানবিকতার পরিচয় দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধি করেছেন। এছাড়া বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হয়েছে বাংলাদেশ।

জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার আট দশক ছুঁইছুঁই মুহূর্তে সংস্থাটির কাঠামো—বিশেষ করে ‘নিরাপত্তা পরিষদ’ সংস্কারের দাবি জোরালো হচ্ছে। পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতি ও উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তির সাথে সামঞ্জস্য রেখে নিরাপত্তা পরিষদের ক্ষমতা প্রসার ও আধুনিকায়নের তাগিদ দিচ্ছেন অনেক বিশ্বনেতা।

এত সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও, একটি যুদ্ধমুক্ত, নিরাপদ এবং উন্নত পৃথিবী গড়ার সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক মঞ্চ হিসেবে জাতিসংঘের বিকল্প আজও গড়ে ওঠেনি। আজকের এই শুভ দিনে বিশ্বের প্রতিটি দেশের অঙ্গীকার হওয়া উচিত সংঘাত নয়, বরং পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংলাপের মাধ্যমে একটি শান্তিময় ও বসবাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলা।

পড়ুন : ইতালির ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে পরপর ১২টি ভূমিকম্প, সুনামি ও ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ জারি

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন