পিএইচপির চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে বন্ধ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইট

পিএইচপি (PHP) প্রোগ্রামিং ভাষার একটি গুরুতর বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা ত্রুটির কারণে এবং বৈশ্বিক সাইবার সতর্কতার প্রেক্ষিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো বন্ধ রাখা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট। তবে ওয়েবসাইট বন্ধ থাকলেও দেশের সার্বিক ব্যাংকিং লেনদেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সাথে সংযোগ এবং মূল সেবা প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলার ঝুঁকি সংক্রান্ত বার্তা পাওয়ার পরই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেয়। শনিবার সকাল পর্যন্ত ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা যায়নি এবং সেখানে একটি রক্ষনাবেক্ষণজনিত বার্তা প্রদর্শিত হচ্ছিল। সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলো নিশ্চিত করেছে যে নিরাপত্তা পুরোপুরি সুনিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই পোর্টালটি অফলাইনে রাখা হবে।

ব্যাংকিং কার্যক্রমে প্রভাব নেই, তথ্য সংগ্রহে সাময়িক ভোগান্তি

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ ওয়েবসাইটের সার্বিক নিরাপত্তা পরীক্ষায় কাজ করছে। তবে ঠিক কতক্ষণের মধ্যে এটি চালু হবে, তা নির্দিষ্ট করা হয়নি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “লেনদেন চলছে। তবে গতি একটু কম।”

ওয়েবসাইট বন্ধের কারণে মূল লেনদেনে কোনো ক্ষতি হচ্ছে না বলে নিশ্চিত করেছেন ব্যাংকিং খাতের প্রতিনিধিরা। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, “আমাদের লেনদেনে বা কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে সমস্যা হয়নি।”

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পোর্টালে বিভিন্ন অর্থনৈতিক উপাত্ত, পরিসংখ্যান, নীতিমালা ও প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে মূলত থাকে ইনফরমেশন। মানি ট্রানজেকশন সিস্টেমের সঙ্গে ওয়েবসাইটের কোনো সম্পর্ক নেই।” ফলে সাধারণ মানুষ, গবেষক ও ব্যাংকগুলোর তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এটি সাময়িক অসুবিধার সৃষ্টি করছে।

কেন ওয়েবসাইট বন্ধ এবং গ্রাহকদের অর্থ কতটুকু নিরাপদ?

এমটিবি পিএলসির চিফ ডিজিটাল অফিসার খালিদ হোসেন বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, “ওয়েবসাইটের সঙ্গে লেনদেনের প্রযুক্তিগত কানেকশন নাই। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট মূলত কিছু তথ্য শেয়ার করে। ওয়েবসাইট বন্ধ হলেই কাজে প্রভাব পড়ে—এমন কোনো ব্যাপার নেই।”

তিনি উল্লেখ করেন, ওয়েবসাইটের নিয়ন্ত্রণ হ্যাকাররা নিলেও তারা বড়জোর তথ্য বিকৃত বা কোনো ছবি-বার্তা ঝুলিয়ে দিতে পারে। গ্রাহকের আমানত বা আর্থিক তথ্যের ওপর এর কোনো প্রভাব নেই, কারণ এগুলো পরিচালিত হয় টিসিএস, ওরাকল বা ইনফোসিসের মতো এন্টারপ্রাইজ লেভেলের ‘কোর ব্যাংকিং সিস্টেম’ দিয়ে—যেগুলোতে পিএইচপি ব্যবহৃত হয় না।

গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড বা বৈশ্বিক চর্চার অংশ হিসেবে আক্রমণের উৎসকে সাময়িকভাবে অফলাইনে নেওয়ার এই পদক্ষেপকে যৌক্তিক ও যথার্থ বলেছেন খাতের বিশেষজ্ঞরা। পিএইচপি কোডের আপডেট প্রয়োগ, রিইন্সটলেশন ও ব্যাকএন্ড টেস্ট করার জন্যই এটি অফলাইনে রাখা জরুরি। বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওয়েবসাইট বন্ধ রেখে সঠিক পরীক্ষণই করছে, তবে বেসরকারি ব্যাংকের তুলনায় সরকারি প্ল্যাটফর্মগুলো কিছুটা বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

বিশ্বজুড়ে সাইবার আতঙ্ক ও এআই প্রযুক্তির ভূমিকা

পিএইচপি বা ‘হাইপারটেক্সট প্রিপ্রসেসর’ হলো এমন একটি কোডিং প্ল্যাটফর্ম যা অনলাইন শপ, উইকিপিডিয়া ও ওয়ার্ডপ্রেসের মতো বিশ্বের বেশিরভাগ ওয়েবসাইটের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির সহায়তায় ক্যালিফ ও উইজ নামের দুটি সাইবার সিকিউরিটি ফার্ম পিএইচপিতে মারাত্মক এই প্রযুক্তিগত ত্রুটিগুলো শনাক্ত করে।

গরিলা সাইবার সিকিউরিটির প্রধান নির্বাহী পল স্পেন সতর্ক করে জানান, এআই-এর কারণে আক্রমণকারীরা প্রমাণীকরণ ছাড়াই সার্ভার নিয়ন্ত্রণ বা সংবেদনশীল তথ্য চুরি করতে পারে। ওপেনএআই এই আবিষ্কারকে “সাম্প্রতিক কালের অন্যতম প্রভাবশালী নিরাপত্তা সমস্যা” বলে চিহ্নিত করেছে এবং গবেষকরা একে এআই দিয়ে শনাক্ত করা “সবচেয়ে গুরুতর” দুর্বলতাগুলোর একটি বলেছেন। আন্তর্জাতিক সুপারিশ অনুযায়ী বিশ্বের বহু প্রতিষ্ঠান এখন তাদের ওয়েবসাইট অফলাইনে রেখে সিকিউরিটি আপডেট ইন্সটল করছে।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের সংরক্ষিত রিজার্ভ থেকে হ্যাকাররা ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি করে নিয়ে যায়। ওই আলোচিত ঘটনাটির পর তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান পদত্যাগ করেন এবং দেশের আর্থিক খাতের সাইবার নিরাপত্তা একটি বড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়েছিল।

পড়ুন : ইতালির ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে পরপর ১২টি ভূমিকম্প, সুনামি ও ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ জারি

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন