৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ দামে ব্রেন্ট ক্রুড, ব্যারেলপ্রতি ছাড়াল ১১৬ ডলার

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে বেড়ে গত এপ্রিলের শেষ দিকের পর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। শনিবার (২৪ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলার ছাড়িয়ে যায়। বিশ্ববাজারে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধের টানটান উত্তেজনা এবং আসন্ন শীত মৌসুমে জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধির আশঙ্কা—এই ত্রিমুখী কারণে তেলের বাজারে ব্যাপক ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাজারের হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আগামী ডিসেম্বর সরবরাহের জন্য ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৬ দশমিক ৭২ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে পৌঁছায় ব্যারেলপ্রতি ১০৩ দশমিক ২৭ ডলারে।

তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে। দরপতন এবং বড় ঝুঁকির আশঙ্কায় শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের প্রধান সূচকগুলো সারাদিন নেতিবাচক ধারায় ছিল। দিনশেষে ডাও জোন্স সূচক কমেছে ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং নাসডাক সূচকে পতন ঘটেছে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে, এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলো প্রযুক্তি খাতের কিছু শেয়ারের ঘুরে দাঁড়ানোর মাধ্যমে সপ্তাহ শেষ করেছে মিশ্র প্রবণতায়।

আইজি প্ল্যাটফর্মের প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্প মনে করেন, সপ্তাহান্তের আগে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে অর্থ রাখার বিষয়ে অনিচ্ছার কারণে বিনিয়োগকারীরা হঠাৎ করে তাদের অবস্থান বদলে ফেলছেন।

ইউরোপের বাজারেও বড় ধরনের ধস লক্ষ্য করা গেছে:

কেরিং ও গুচি: ফরাসি বিলাসপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কেরিংয়ের আর্থিক প্রতিবেদন বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে না পারায় এর শেয়ারদর এক দিনেই ১৬ শতাংশের বেশি পড়ে যায়। বিশেষ করে তাদের ফ্ল্যাগশিপ ব্র্যান্ড ‘গুচি’র ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে শঙ্কা থাকায় এই পতন ঘটে।

ভলভো কারস: সুইডেনের এই গাড়ি নির্মাতার শেয়ারদর এক লাফেই ২৪ শতাংশের বেশি পড়ে গেছে। চীনের বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং মার্কিন শুল্কের কারণে তৃতীয় প্রান্তিকে লোকসান গুনেছে প্রতিষ্ঠানটি। আর্থিক চাপ সামলাতে তারা ৫ বিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনারের ব্যয় কমানোর ঘোষণা দিয়েছে, যার অধীনে সুইডেনে ২ হাজার এবং বিশ্বের অন্যত্র আরও ৫০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এআই খাতের বিনিয়োগ নিয়ে নতুন হিসেব-নিকাশ:

জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিশাল মূলধনি ব্যয়ের স্থায়িত্ব নিয়েও সংশয়ে ভুগছেন বিনিয়োগকারীরা। বিশেষ করে ডেটা সেন্টার তৈরি ও পরিচালনায় ঢালাও বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফা কতটা আসবে, তা নতুন করে ভাবাচ্ছে।

এজে বেলের আর্থিক বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান ড্যানি হিউসন জানান, তেলের উচ্চমূল্যের সাথে সাথে এআই খাতে বিপুল খরচের স্থায়িত্ব নিয়ে বাজার এখন বেশ চিন্তিত। তিনি বলেন, ইউক্রেন সংকট এবং উত্তর গোলার্ধে শীতের প্রস্তুতি তেলের বাজারে আরও চাপ সৃষ্টি করছে।

অন্যদিকে, ক্রেসেট ক্যাপিটালের প্রধান বাজার কৌশলবিদ জোসেফ জিডল উল্লেখ করেন, মাত্র ছয় মাস আগে বিনিয়োগকারীরা এই ধরনের মূলধনি ব্যয়কে যে দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতেন, বর্তমানে তারা সেটিকে সম্ভাব্য দায়ের পাল্লায় মাপছেন।

বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ ও শঙ্কা:

বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববাজারে উচ্চ জ্বালানি মূল্য, জিওপলিটিক্যাল সংঘাত এবং প্রযুক্তি খাতের অনিশ্চয়তা—এই তিনটি বিষয় বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। তেলের চড়া দাম দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বের উৎপাদন, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ব্যবসায়িক লাভের মুখ দেখা কঠিন হবে। সামনের দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের পরিস্থিতির অগ্রগতি, জ্বালানির বৈশ্বিক চাহিদা এবং এআই বিনিয়োগের বাস্তব লাভের ওপর ভিত্তি করেই শেয়ারবাজারের চূড়ান্ত গতিপথ নির্ধারিত হবে।

পড়ুন : পিএইচপির চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে বন্ধ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইট

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন