মিষ্টি কুমড়া—নাম শুনলেই মনে পড়ে পরিচিত সেই সবজির কথা। কখনো ভাজি, কখনো ভর্তা, আবার কখনো ডাল কিংবা মাছের সঙ্গে রান্না করে খাওয়া হয় এটি। তবে রান্নাঘরের চেনা এই উপকরণটির গল্প শুধু খাবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কুমড়া ঘিরে রয়েছে নানা ঐতিহ্য, উৎসব, পুষ্টিগুণ আর মজার সব তথ্য। এমনকি উদ্ভিদবিজ্ঞানের হিসাবে কুমড়া সবজি নয়, ফল!
আজ ২৬ অক্টোবর জাতীয় কুমড়া দিবস। যুক্তরাষ্ট্রে পরিচিত এই দিবসের মূল আকর্ষণ কুমড়ার বহুমুখী ব্যবহার, পুষ্টিগুণ ও জনপ্রিয়তা। শরৎকালীন উৎসব থেকে হ্যালোইনের সাজসজ্জা—বিভিন্ন আয়োজনে কুমড়ার রয়েছে বিশেষ জায়গা। বিশাল আকৃতির কুমড়া যেমন মানুষের বিস্ময় জাগায়, তেমনি এর বীজ ও ফুলও ব্যবহৃত হয় খাবার তৈরিতে।
কুমড়ার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস, পুষ্টিগুণ ও অজানা কিছু তথ্য জানলে পরিচিত এই সবজি সম্পর্কে ধারণাই বদলে যেতে পারে।
কুমড়া দিবসের পেছনের গল্প
জাতীয় কুমড়া দিবসের সূচনা ঠিক কবে, কীভাবে—তা নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। তবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ২৬ অক্টোবর দিনটি পালনের উল্লেখ রয়েছে। কুমড়ার খাবার, সাজসজ্জা ও শরৎকালীন ঐতিহ্যের সঙ্গে দিবসটির সম্পর্ক রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের থ্যাংকসগিভিং উৎসবে কুমড়ার পাই বেশ জনপ্রিয়। কুমড়ার শাঁস, দুধ, ডিম, চিনি ও বিভিন্ন মসলা দিয়ে তৈরি করা হয় এই মিষ্টি খাবার। অন্যদিকে, ৩১ অক্টোবরের হ্যালোইন উৎসবেও কুমড়ার ব্যবহার চোখে পড়ে। কুমড়ার গায়ে চোখ, নাক ও মুখের নকশা কেটে ভেতরে আলো জ্বালিয়ে তৈরি করা হয় ‘জ্যাক-ও-ল্যান্টার্ন’।
এই প্রথার শিকড় আয়ারল্যান্ডের পুরোনো লোককথায়। সেখানে একসময় কুমড়ার পরিবর্তে শালগমের মতো সবজি কেটে সাজানোর প্রচলন ছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্রে কুমড়া সহজলভ্য হওয়ায় হ্যালোইনের সাজসজ্জায় এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
কোন কোন দেশে পালিত হয় কুমড়া দিবস?
২৬ অক্টোবর জাতীয় কুমড়া দিবস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে পরিচিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দিবসের তালিকায় কানাডা ও যুক্তরাজ্যেও দিনটি পালনের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে দেশভেদে দিবসটির আয়োজন ও জনপ্রিয়তায় পার্থক্য রয়েছে। এটি এসব দেশে সরকারি জাতীয় ছুটির দিন নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে হ্যালোইন ও শরৎকালীন উৎসবের সাজসজ্জা থেকে শুরু করে কুমড়ার পাই, স্যুপসহ নানা খাবারে এর ব্যবহার দেখা যায়। কানাডায় শরৎকালীন উৎসব, কুমড়া প্রদর্শন ও কুমড়ার তৈরি খাবারের আয়োজন রয়েছে। যুক্তরাজ্যেও হ্যালোইন উপলক্ষে কুমড়া কেটে সাজানো এবং বিভিন্ন খামারে কুমড়া সংগ্রহের আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশেও কুমড়া আমাদের প্রতিদিনের খাবারের পরিচিত উপাদান। দিবসটি উপলক্ষে কুমড়ার নতুন কোনো পদ তৈরি করা কিংবা এর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানার মধ্য দিয়ে দিনটিকে স্মরণ করা যেতে পারে।
কুমড়ার পুষ্টিগুণে কী আছে?
মিষ্টি কুমড়ায় রয়েছে বিভিন্ন ভিটামিন, খনিজ উপাদান, খাদ্যআঁশ ও পানি। সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে এটি শরীরের প্রয়োজনীয় কিছু পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করতে পারে।
কুমড়ায় থাকা বিটা-ক্যারোটিন শরীরে ভিটামিন এ তৈরিতে সাহায্য করে। ভিটামিন এ স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া কুমড়ায় থাকা ভিটামিন এ ও সি শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে।
কুমড়ার খাদ্যআঁশ অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। পর্যাপ্ত পানি ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবারের সঙ্গে এটি খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধেও উপকার হতে পারে।
কুমড়ায় পানির পরিমাণ বেশি এবং ক্যালরি তুলনামূলক কম। তাই পরিমিত পরিমাণে খেলে পেট ভরা রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে রান্নায় অতিরিক্ত তেল, চিনি কিংবা ঘি ব্যবহার করলে খাবারের মোট ক্যালরি বেড়ে যায়। কুমড়ায় থাকা পটাশিয়ামও পেশির স্বাভাবিক কাজ ও শরীরের তরল ভারসাম্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে।
কুমড়া নিয়ে ৭টি মজার তথ্য
১. সবজি ভেবে খেলেও কুমড়া আসলে ফল
রান্নায় কুমড়াকে সবজি হিসেবে ব্যবহার করা হলেও উদ্ভিদবিজ্ঞানের হিসাবে এটি ফল। ফুলের গর্ভাশয় থেকে কুমড়া তৈরি হয় এবং এর ভেতরে বীজ থাকে। তবে খাবারের শ্রেণিবিভাগে কুমড়াকে সাধারণত সবজি হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।
২. কুমড়ার বীজও পুষ্টিকর খাবার
কুমড়ার ভেতরের বীজ ফেলে না দিয়ে পরিষ্কার করে শুকিয়ে কিংবা ভেজে খাওয়া যায়। এতে প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান রয়েছে। তবে বীজ তৈরির সময় অতিরিক্ত লবণ ও তেল ব্যবহার না করাই ভালো।
৩. অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া প্রায় সব মহাদেশেই কুমড়া জন্মে
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কুমড়ার চাষ হয়। অনুকূল ও উষ্ণ আবহাওয়ায় এ গাছ ভালো জন্মায়। তবে কুমড়ার জাত ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে চাষের উপযোগিতা বদলে যায়।
৪. কয়েকশ কেজির কুমড়াও হয়
সাধারণ কুমড়া সহজেই হাতে বহন করা যায়। কিন্তু বিশেষ জাতের কুমড়া প্রতিযোগিতার জন্য বিশাল আকারে চাষ করা হয়। এসব কুমড়ার ওজন কয়েকশ কেজি ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি বিশ্বে এক টনের বেশি ওজনের কুমড়া উৎপাদনের রেকর্ডও রয়েছে।
৫. কুমড়ার ফুল দিয়েও তৈরি হয় খাবার
কুমড়ার শুধু ফল নয়, ফুলও কিছু দেশের রান্নায় ব্যবহৃত হয়। এই ফুল দিয়ে ভাজা, পুর ভরা খাবার ও সালাদ তৈরি করা যায়। তবে ফুল সংগ্রহের সময় গাছের পরাগায়ন ও ফল ধরার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
৬. হ্যালোইনে কুমড়ার আগে ব্যবহৃত হতো শালগম
হ্যালোইনে মুখের নকশা কেটে সাজানোর প্রথায় একসময় আয়ারল্যান্ডে শালগমের মতো সবজি ব্যবহার করা হতো। পরে যুক্তরাষ্ট্রে কুমড়া জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কুমড়ার ভেতরের অংশ বের করে নকশা কাটা তুলনামূলক সহজ হওয়ায় এটি হ্যালোইনের পরিচিত প্রতীকে পরিণত হয়।
৭. কুমড়া মানেই কমলা নয়
কুমড়া দেখলেই কমলা রঙের কথা মনে আসতে পারে। কিন্তু সব কুমড়ার রং এক নয়। জাতভেদে কুমড়া সবুজ, হলুদ, সাদা কিংবা লালচে হতে পারে। শুধু রঙেই নয়, আকার ও স্বাদের দিক থেকেও বিভিন্ন জাতের কুমড়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
পরিচিত এই সবজির রয়েছে বিচিত্র ব্যবহার, পুষ্টিগুণ ও ইতিহাস। রান্নার পদ হিসেবে কুমড়ার কদর থাকলেও এর বীজ ও ফুলও খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কুমড়াকে ঘিরে গড়ে উঠেছে উৎসব ও ঐতিহ্য।
জাতীয় কুমড়া দিবস তাই কেবল একটি সবজিকে ঘিরে উদ্যাপন নয়; পরিচিত খাবারটির নানা দিক নতুন করে জানারও উপলক্ষ। আজ কুমড়া দিয়ে নতুন কোনো পদ তৈরি করতে পারেন, কিংবা পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন কুমড়া নিয়ে জানা এই মজার তথ্যগুলো।
পড়ুন: চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের নির্বাচনে লুলার জয়
আর/


