সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর স্পষ্ট দায়িত্ব এবং আইন বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত বক্তারা।
২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার ২০২৬ জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর উদ্যোগে ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন: বর্তমান প্রেক্ষিত ও সরকারের অঙ্গীকার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ আলোচনা হয়। বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব হাবিবুর রশিদ এমপি। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা ও কী নোটস উপস্থাপন করেন নিসচার মহাসচিব জনাব লিটন এরশাদ।
গোলটেবিল বৈঠকের শুরুতে কানাডা থেকে ভার্চুয়ালি বক্তব্য রাখেন নিসচার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব মিরাজুল মইন জয়। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, আমরা সরকারকে এই মর্মে সাধুবাধ জানাতে চাই সড়কে নিরাপত্তা সসংহত করতে নিসচার স্বপ্নদ্রষ্টা ইলিয়াস কাঞ্চনের দীর্ঘদিনের চাওয়া সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য। আমি আশা করবো আজকের গোলটেবিল বৈঠকের সারসংক্ষেপসহ অংশীজনদের মতামতের আলোকে ২০২৭ সালের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়িত হবে।
এরপর নিসচার প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান জনাব ইলিয়াস কাঞ্চন লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যে তিনি বলেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে আমি বর্তমানে লন্ডনে চিকিৎসাধীন। প্রিয় দেশ থেকে দূরে থাকলেও আমার মন পড়ে আছে আপনাদের কাছে, নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের কাছে। আমার অসুস্থতার সময়ে যাঁরা খোঁজ নিয়েছেন, ভালোবাসা জানিয়েছেন এবং সুস্থতার জন্য দোয়া করছেন, তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি আমি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই।
তিনি আরও বলেন, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের এই ইতিহাস কোনো ব্যক্তির একার নয়, এটি সড়কে স্বজন হারানো মানুষের, নিসচার নিবেদিত কর্মীদের এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে কণ্ঠ তোলা দেশবাসীর সম্মিলিত ইতিহাস। তাই নিসচাকে তার ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করা, এর অবদান আড়াল করা কিংবা ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের প্রতিষ্ঠিত তাৎপর্যকে মুছে ফেলা বা বিকৃত করার যেকোনো প্রচেষ্টা আমি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। দীর্ঘদিনের আন্দোলন, ত্যাগ ও প্রামাণ্য ইতিহাসকে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে মুছে ফেলা যায় না। যারা ইতিহাস ও অবদান নিয়ে কথা বলবেন, তাঁদের কাছে আমার আহ্বান তথ্য, নথি ও সত্যের ভিত্তিতে কথা বলুন। নিসচার ভূমিকা বা ২২ অক্টোবরের তাৎপর্যকে খাটো করে দেখানোর কোনো চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। এ ইতিহাসকে বিকৃত হতে দেওয়া হবে না।
বক্তব্যে তিনি বলেন, গত ৩৩ বছর ধরে নিসচা সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি, দুর্ঘটনা প্রতিরোধের দাবি এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার কাজ করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় নিরাপদ সড়ক চাই স্লোগান ধারন করে ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাস্তবায়িত হয়। নিসচা বর্তমানে সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নে সরকারের উদ্যোগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে এবং সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।
এরপর নিসচার মহাসচিব জনাব লিটন এরশাদ গোল টেবিল বৈঠকে নিসচার পক্ষ থেকে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর অভিজ্ঞতা, প্রস্তাবিত সড়ক নিরাপত্তা আইনের প্রয়োজনীয়তা, নিরাপদ ব্যবস্থা পদ্ধতি (Safe System), দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, সড়ক নিরাপত্তার পাঁচটি স্তম্ভ এবং আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভূমিকা তুলে ধরেন।
গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব হাবিবুর রশিদ এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে আলোচ্য বিষয়ের উপর বক্তব্য রাখেন বিআরটিএ চেয়ারম্যান জনাব হাবীবুর রহমান, বিআরটিসি’র চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) জনাব মীর আহমেদ তারিকুল ওমর, বিএফইউজে-এর মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী, দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ, বুয়েটের অধ্যাপক ও সড়ক বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জনাব মোঃ আইয়ুব ভুঁইয়া, হাইওয়ে পুলিশের অ্যাডিশনাল ডিআইজি (অপারেশন্স) জনাব মুনতাসিরুল ইসলাম পিপিএম, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি), ট্রাফিক জনাব মো আনিছুর রহমান, সাবেক সচিব ড. শরীফুল আলম, সাবেক অতিরিক্ত সচিব খালেদ মাহমুদ, সড়ক বিশেষজ্ঞ তাইফুর রহমান, আইইউবি-এর ডিন ও সহযোগী অধ্যাপক জনাব ড. কামরান উল বাসেত এবং বিআরটিএর পরিচালক (রোড সেফটি) মোঃ জিয়াউর রহমানসহ আরও অনেকে।
আলোচনায় বক্তারা সড়ক দুরঘতা নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগ, শক্তিশালী ডাটাসেল এবং বিশেষ করে সড়কপথ, নৌপথ, রেলপথ, ও বিমানপথ একই মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনতে হবে। অন্যান্য দেশের নজির দেখলে আমরা এটা সম্পর্কে নিশ্চিত হবো। শুধু বাংলাদেশ ও ভারত ছাড়া সকল দেশই একই মন্ত্রণালয়ের আওতায় এনে তাঁর উপর কাজ করে সড়ক দুর্ঘটনা নিরসন করতে সক্ষম হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এর সঙ্গে পরিবহনব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো, আইন প্রয়োগ, চালকের প্রশিক্ষণ, যাত্রীসচেতনতা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়গুলো জড়িত। তাই দুর্ঘটনা কমাতে বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপের বদলে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
বক্তারা সড়ক দুর্ঘটনাসংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের জন্য একটি শক্তিশালী ডেটা সেল গঠনের প্রস্তাব করেন। তাঁদের মতে, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা, দুর্ঘটনার কারণ, হতাহত ব্যক্তিদের সংখ্যা ও পরিচয়, যানবাহনের ধরন, সড়কের অবস্থা এবং আইন লঙ্ঘনের তথ্য নিয়মিতভাবে বিশ্লেষণ করা গেলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র বোঝা সম্ভব হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণ এবং নেওয়া পদক্ষেপের কার্যকারিতা যাচাই করাও সহজ হবে।
আলোচনায় পরিবহন খাতগুলোর প্রশাসনিক সমন্বয়ের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বক্তারা বলেন, সড়কপথ, নৌপথ, রেলপথ ও বিমানপথ-সংক্রান্ত পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা একই মন্ত্রণালয়ের আওতায় এনে সমন্বিতভাবে কাজ করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তাঁদের মতে, পরিবহনের বিভিন্ন মাধ্যমের মধ্যে নীতিনির্ধারণ ও তথ্য বিনিময়ে সমন্বয় থাকলে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা সম্ভব।
বক্তারা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, অন্যান্য দেশের পরিবহনব্যবস্থাপনা ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধের উদ্যোগ থেকে শিক্ষা নেওয়া দরকার। তাঁদের বক্তব্য, বাংলাদেশ ও ভারত ছাড়া অন্য দেশগুলোতে পরিবহন খাতগুলো একই মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরিচালিত হয় এবং এ ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর কাজ করা হয়েছে। তাঁরা এ বিষয়ে তুলনামূলক গবেষণা ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশের ওপরও গুরুত্ব দেন।
বৈঠকে আরও বলা হয়, দুর্ঘটনা রোধে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন বা আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। চালকদের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস, ট্রাফিক আইন মেনে চলা, পথচারীর নিরাপত্তা এবং জনসচেতনতা সব ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে সঙ্গে নিয়ে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের আহ্বান জানান আলোচকেরা।
জাতিসংঘ ঘোষিত Safe System, গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকের প্রশিক্ষণ ও কর্মপরিবেশ, যানবাহনের নিরাপত্তা, পথচারী সুরক্ষা, দুর্ঘটনার পর উদ্ধার ও চিকিৎসা বিষয় নিয়ে কথা বলেন। সেইসাথে দুর্ঘটনার তথ্য নির্ভরযোগ্যভাবে সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়ের জন্য কার্যকর Road Safety Data Cell গড়ে তোলার প্রস্তাবও আলোচনায় আসে।
বৈঠকে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর বাস্তবায়ন পর্যালোচনা করে প্রস্তাবিত আইনে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব, নিয়মিত তদারকি এবং অগ্রগতি প্রকাশের ব্যবস্থা রাখার বিষয়ে মতামত দেওয়া হয়। জাতিসংঘের সড়ক নিরাপত্তা কর্মদশক ২০২১–২০৩০-এর লক্ষ্য অর্জনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, সময়সীমা এবং অগ্রগতি পরিমাপের সূচক নির্ধারণের বিষয়েও আলোচনা হয়।
বৈঠকে নিসচার পক্ষ থেকে গত ৩৩ বছর ধরে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি, দুর্ঘটনা প্রতিরোধের দাবি এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। সেইসাথে প্রস্তাবিত সড়ক নিরাপত্তা আইন পর্যালোচনা, অংশীজনদের মতামত তুলে ধরা এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে সংগঠনটি প্রস্তুত থাকার কথা জানান।
পড়ুন : জাতীয় গ্রিড পুনরুদ্ধার শেষ, পর্যায়ক্রমে স্বাভাবিক হচ্ছে বিদ্যুৎ সরবরাহ
সা/


