সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের নাম আ.লীগের কমিটিতে, সরকারি চাকরি নিয়ে বিতর্ক

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চরজানাজা ইউনিয়নে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. বাচ্চু বেপারীকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২০১৯ সালে অনুমোদিত ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ২৪ সদস্যের কমিটিতে তাঁর নাম তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে রয়েছে বলে তথ্য সামনে এসেছে। সরকারি চাকরিতে থেকে রাজনৈতিক দলের পদে থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতাসহ সচেতন মহলের কয়েকজন।
শুধু রাজনৈতিক পদ নয়, বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি ও দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন অভিভাবক ও শিক্ষক। তাঁদের দাবি, তিনি কখনো দেরিতে বিদ্যালয়ে আসেন, আবার নির্ধারিত সময়ের আগেই চলে যান। অন্যদিকে, অভিযোগ অস্বীকার করে বাচ্চু বেপারী দাবি করেছেন, সংশ্লিষ্ট কমিটিতে তিনি ছিলেন না; তাঁর নাম ব্যবহার করা হয়েছে।
২০১৯ সালের কমিটিতে অর্থ ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের মে মাসে শিবচর উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি আবদুল লতিফ মোল্লা ও সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম মিয়া ২৪ সদস্যবিশিষ্ট চরজানাজা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের একটি কমিটি অনুমোদন দেন। ওই কমিটির তালিকায় আব্দুল মজিদ বেপারীকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. বাচ্চু বেপারীর নাম তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে রয়েছে বলে জানা গেছে।
কমিটিতে তাঁর নাম থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে তৎকালীন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম মিয়া বলেন, “২০১৯ সালের কমিটিতে চরজানাজা ইউনিয়নের আব্দুল মজিদ বেপারীকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. বাচ্চু বেপারীকে রাখা হয়েছিল। এই কমিটি আমরাই অনুমোদন দিয়েছিলাম।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা দাবি করেন, দলটি ক্ষমতায় থাকাকালে বাচ্চু বেপারী তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করতেন। তাঁদের ভাষ্যমতে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ব্যাপারে তিনি আগ্রহী ছিলেন এবং স্বজনদের মাধ্যমেও সুপারিশ করিয়েছিলেন।
সরকারি চাকরিতে রাজনৈতিক পদ: কী বলছে আইন?

বিজ্ঞাপন

১৯৭৯: এই বিধিমালার বিধি-২৫ (১) অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক দলের বা রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনের সদস্য হতে পারবেন না। কিংবা অন্যভাবে ওই দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকতে পারবেন না। একই সঙ্গে বাংলাদেশে বা বিদেশে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বা কোনোভাবে সহায়তা করার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হতে পারে।এসব বিধানের আলোকে বাচ্চু বেপারীর নাম আওয়ামী লীগের কমিটিতে থাকার অভিযোগটি যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিয়েও অভিযোগ
রাজনৈতিক পদে থাকার বিতর্কের পাশাপাশি বাচ্চু বেপারীর বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন অভিভাবক। তাঁদের দাবি, তিনি সব সময় নির্ধারিত সময়ে বিদ্যালয়ে আসেন না এবং কখনো কখনো দুপুরের আগেই চলে যান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বাবা বলেন, “বাচ্চু স্যার অনেক দিন সকাল ১০টার পরে স্কুলে আসেন। আবার কখনো দুপুর ১২টার আগেই চলে যান। সব সময় তাঁকে স্কুলে পাওয়া যায় না।”
বিদ্যালয়ের এক সাবেক শিক্ষার্থীর মা রুপা বেগম বলেন, “আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় তিনি নিয়মিত স্কুলে আসতেন না। স্কুলে না এসেও বেতন নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে তখন ভয়ে কেউ কথা বলতে সাহস পেত না।”
বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকও নাম প্রকাশ না করার শর্তে একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, বাচ্চু বেপারী কখনো দেরিতে বিদ্যালয়ে আসেন, আবার কিছু সময় পর চলে যান। দাপ্তরিক কাজেও অনিয়ম রয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
এক শিক্ষক বলেন, “স্যার মাঝে মাঝে সকাল ১০টার পরে আসেন, আবার ১১টা বা ১২টার দিকে চলে যায়। স্থানীয় হওয়ায় অনেক সময় কিছু বলা কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর রাজনৈতিক পদে থাকার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা রয়েছে।”
এদিকে তার বিষয়ে চরজানাজা ইউনিয়নের এক ইউপি সদস্য নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনি বলেন, বাচ্চু বেপারী আওয়ামী লীগ থাকা অবস্থায়ও ক্ষমতা অপব্যবহার করে স্কুল ফাঁকি দিয়েছেন এখনো সেই পথেই তিনি কাজ করছেন। আওয়ামী লীগের পথধারী একজন নেতা। আওয়ামী লীগের পদে থেকে কিভাবে সে সরকারি চাকরি করে। সরকারি চাকরি যারা করে তারা তো কোন দলীয় পদে থাকতে পারে না এত সরকারি বিধান আছে। সরকারি নিয়ম নীতি কে তোয়াক্কা না করে কিভাবে এখনো সে চাকরি করে।

রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ
চরজানাজা ইউনিয়ন বিএনপির একাধিক নেতার অভিযোগ, বাচ্চু বেপারী এলাকায় প্রভাবশালী এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চলতেন। তাঁদের দাবি, এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে অনেকেই সংকোচ বোধ করেন।

স্থানীয় বিএনপি নেতা আলমগীর মৃধা বলেন, “বাচ্চু বেপারী আওয়ামী লীগের নেতা হয়ে কীভাবে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন, তা খতিয়ে দেখা দরকার। এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”

জেলা বিএনপির সদস্যসচিব জাহান্দার আলী জাহান বলেন, অতীতে মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন ও মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ থাকা ব্যক্তিরা কীভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন, তা তদন্ত করা উচিত। বাচ্চু বেপারী রাজনৈতিক পদে থেকে থাকলে প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

তদন্তের আশ্বাস শিক্ষা কর্মকর্তাদের

শিবচর উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রুপা সৈয়দা বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। কোনো শিক্ষক রাজনৈতিক দলের পদে থেকে থাকলে বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মাদারীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজলে এলাহি বলেন, কোনো শিক্ষক সরাসরি রাজনৈতিক পদে থাকতে পারবেন না। এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযোগ অস্বীকার শিক্ষকের
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. বাচ্চু বেপারী বলেন, তাঁকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট আওয়ামী লীগের কমিটিতে তিনি ছিলেন না দাবি করে তিনি বলেন, তাঁর নাম ব্যবহার করা হয়েছে।
সরকারি চাকরিতে থেকে রাজনৈতিক পদে থাকার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “আপনারা এ নিয়ে নিউজ করলে করেন, আমার কোনো সমস্যা নেই। কারণ আমি সব বিষয় ম্যানেজ করে চলি।”
তবে বিদ্যালয়ে অনিয়মিত উপস্থিতি এবং দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি নির্দিষ্ট জবাব না দিয়েই ফোন কেটে দেন।

পড়ুন:​গাইবান্ধায় সমতা ও ডিজিটাল সুরক্ষায় স্থানীয় সরকারের সঙ্গে যুব সংলাপ

ইমি/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন