সৌদি আরবে হুতি গোষ্ঠীর হামলা জোরদার হওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশটিকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার অনুমোদন পেয়েছেন মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। গত সোমবার পার্লামেন্টের স্পিকার হিশাম বাদাওয়ির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে ভোটের মাধ্যমে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। সৌদি আরবের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির আত্মরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে মিসরের প্রেসিডেন্টকে। তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে উপসাগরীয় অঞ্চল ও লোহিত সাগরজুড়ে চলমান সংঘাতে মিসর সরাসরি জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মিসরের পার্লামেন্টের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের আত্মরক্ষায় সহায়তা করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবেন আল-সিসি। এ সিদ্ধান্তের পর হুতি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। গোষ্ঠীটির রাজনৈতিক শাখার সদস্য মোহাম্মদ আলী আল-হুতি মিসরের এই সিদ্ধান্তকে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার অনুমোদন ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাতের মধ্যে মিসরের এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে মিসরের সাবেক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী হুসেইন হারিদি মনে করেন, চলমান সংঘাতে কায়রোর সম্পৃক্ততা আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। অর্থাৎ, সৌদি আরবকে সহায়তার অনুমোদন পাওয়া মানেই মিসর সরাসরি বড় ধরনের সামরিক অভিযানে অংশ নেবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
তবু পার্লামেন্টের এই অনুমোদন সংঘাতের পরিধি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মিসর কী ধরনের সহায়তা দেবে, তা এখনো বিস্তারিতভাবে জানা যায়নি। এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর আঞ্চলিক পরিস্থিতির গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করতে পারে।
সম্প্রতি সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক মক্কায় ন্যাটোর আদলে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে অন্য দুই দেশের ওপর হামলা হিসেবেও বিবেচনা করা হবে। ফলে কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে বাকি দুই দেশও প্রতিরক্ষায় ভূমিকা রাখার বিষয়টি সামনে আসতে পারে।
তবে চলতি মাসের শুরুতে হুতিরা সৌদি আরবে হামলা জোরদার করার পরও তাদের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালানোর ঘোষণা দেয়নি পাকিস্তান ও তুরস্ক। এ পরিস্থিতিতে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং মিসরের সামরিক সহায়তার অনুমোদন আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
হুতিদের রাজনৈতিক শাখার সদস্য মোহাম্মদ আলী আল-হুতি ওই প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ইরানের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ও প্রকাশ্য আগ্রাসন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘যে জোটই গঠন করা হোক না কেন, আমরা তাতে ভীত নই।’
হুতিদের এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে তারা নিজেদের স্বার্থের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। তবে এই বক্তব্যের পর গোষ্ঠীটি কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে সৌদি আরবের দুটি অঞ্চল লক্ষ্য করে হুতিদের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করার দাবি করেছে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। মঙ্গলবার জোটটির পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়।
জোটের দাবি অনুযায়ী, হুতিরা সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের দিকে তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং দক্ষিণাঞ্চলের দিকে চারটি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এ তথ্য জানান।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি সত্য হলে, দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোকে লক্ষ্য করে হুতিদের হামলার পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বা কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, বিমানবন্দর ও সামরিক ঘাঁটি দেশটির অর্থনীতি এবং নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা বাড়লে শুধু সৌদি আরব নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও আঞ্চলিক বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি হুতিদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য আর্থিক প্রস্তাব দেওয়ার খবরও সামনে এসেছে। সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, বিমানবন্দর ও সামরিক ঘাঁটিতে হামলা বন্ধের বিনিময়ে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের এক বিলিয়ন ডলার বা ১০০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রস্তাব করেছে রিয়াদ। এ প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইরান কাজ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘ইসরায়েল হায়োম’-এর তথ্যের বরাত দিয়ে এ কথা জানানো হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, ইরানের মাধ্যমে হুতিদের কাছে একটি আর্থিক প্যাকেজ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে সৌদি আরব।
প্রস্তাবটির মূল লক্ষ্য একটি টেকসই যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা। পাশাপাশি হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সরকারি কর্মীদের বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং বেসামরিক অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের মতো বিষয়গুলোর সমাধান করার কথাও এতে রয়েছে।
বিনিময়ে হুতিদের সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, বিমানবন্দর ও সামরিক স্থাপনায় হামলা বন্ধ করতে হবে। তবে প্রস্তাবিত অর্থের কোনো অংশ হস্তান্তর করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একইভাবে হুতিরা প্রস্তাবটি গ্রহণ করেছে কি না, সে সম্পর্কেও নির্ভরযোগ্য নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে মিসরের অনুমোদন, হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর এবং ১০০ কোটি ডলারের আর্থিক প্রস্তাব—সব মিলিয়ে ইয়েমেন ও উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে।
একদিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক দেশগুলোর সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে হুতিদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে হামলা বন্ধের প্রচেষ্টার খবরও সামনে এসেছে। তবে সামরিক প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক আলোচনার এই দুই ধারার মধ্যে কোনটি শেষ পর্যন্ত কার্যকর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নের পরিবর্তে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে যুদ্ধবিরতি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে মিসরের সামরিক সহায়তার প্রকৃতি, হুতিদের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং সৌদি আরবের আর্থিক প্রস্তাবের অগ্রগতি পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আপাতত পুরো অঞ্চলের নজর কূটনৈতিক তৎপরতা ও সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের দিকে।
পড়ুন:ইসরায়েলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস, সমানে-সমান নেতানিয়াহু ও বিরোধী জোট
ইমি/


