ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট গণনার ৮৫ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হলেও কোনো জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত পাওয়া ফলাফলে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ৫৩টি আসন এবং গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোট ৪৮টি আসন পেয়েছে। অন্যদিকে, আরব দলগুলো পেয়েছে ১৯টি আসন, যা ঐতিহাসিকভাবে সর্বোচ্চ। ফলে দেশটির পরবর্তী সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আরব দলগুলোর অবস্থান।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করতে অন্তত ৬১টি আসন প্রয়োজন। কিন্তু প্রাথমিক ফলাফলে কোনো পক্ষই সেই ‘ম্যাজিক ফিগার’ ছুঁতে পারেনি। এতে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ দলগুলোকে নতুন নির্বাচন এড়াতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু ও আইজেনকোট উভয়েই সরকার গঠনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনের পর সরকার গঠনের প্রচেষ্টায় আরব দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব ও ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর। দেশটির রাজনীতিতে তাদের প্রতিনিধিত্বকারী একাধিক দল রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মনসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন রাআম এবং হাদাশ, তাআল ও বালাদ নিয়ে গঠিত জয়েন্ট লিস্ট। এই জোটের নেতৃত্বে রয়েছেন ইউসুফ জাবারিন।
দীর্ঘদিন ধরে নেতানিয়াহুর কট্টর জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক অবস্থান এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাঁর নীতির বিরোধিতা করে আসছেন আরব ভোটারদের একটি বড় অংশ। ফলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তাদের সমর্থন বিরোধী শিবিরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বুধবার জয়েন্ট লিস্টের নেতা জাবারিন বলেন, ইসরায়েলের জনগণ নতুন নেতৃত্বের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। নেতানিয়াহুর ‘রক্তাক্ত সরকার’ পরিবর্তন করতে আগ্রহীদের তাঁর দলের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জাবারিনের ভাষায়, ইসরায়েলের সামনে এখন দুটি পথ খোলা রয়েছে। একটি হলো বর্ণবাদ, বঞ্চনা ও আধিপত্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। অন্যটি হলো ইহুদি ও আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যে অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর এই বক্তব্যে সরকার গঠনের আলোচনায় আরব দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে।
তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার প্রশ্নে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরে মতপার্থক্য রয়েছে। আইজেনকোটসহ কয়েকজন নেতা আরব দলগুলোকে নিয়ে সরাসরি জোট সরকার গঠনের বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, বামপন্থি দল ডেমোক্র্যাটসের নেতা ইয়ার গোলান আরবদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে গোলান বলেন, ইহুদি ও আরব ভোটের মধ্যে বর্ণবাদী বিভাজন আর মেনে নেওয়া যায় না। দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে রাজনৈতিক পরিবর্তন আনার সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিরোধী জোটের সামনে আরেকটি সম্ভাবনা হলো সংখ্যালঘু সরকার গঠন। এ ব্যবস্থায় আরব দলগুলো সরাসরি সরকারে যোগ না দিয়েও পার্লামেন্টের গুরুত্বপূর্ণ ভোটাভুটিতে আইজেনকোটকে সমর্থন দিতে পারে। এর ফলে আনুষ্ঠানিক জোট ছাড়াই সরকার টিকিয়ে রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এএফপির প্রতিবেদনে পর্যবেক্ষকদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এমন ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং সরকারের আস্থা ধরে রাখার ক্ষেত্রে আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়মিত প্রয়োজন হতে পারে। কোনো পর্যায়ে সমর্থন প্রত্যাহার করা হলে সরকার নতুন সংকটে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুও আরব দলগুলোর সমর্থনের ভিত্তিতে সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেছেন, ইসরায়েলি আরবদের সমর্থন নিয়ে কোনো নেতার দেশ শাসন করা উচিত নয়। তাঁর মতে, ডানপন্থিদের নিয়ে একটি শক্তিশালী সরকার গঠন করতে হবে।
লিকুদ পার্টির এই নেতা আরও বলেন, ইহুদি ও জায়নবাদী সংখ্যাগরিষ্ঠকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং আরব দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠন গ্রহণযোগ্য নয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনে নেতানিয়াহু ইহুদি ভোটারদের উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছেন। তবে সেই সমর্থন তাঁকে সরাসরি সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর ক্ষমতায় থাকার সুযোগ রয়েছে।
নির্বাচনের পর সরকার গঠনের সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক বিশ্লেষণ উঠে এসেছে। আলজাজিরার বুধবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টার লাইভ ব্লগে বলা হয়, কোনো পক্ষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের মধ্যে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের আলোচনা সামনে আসতে পারে। তবে এ ধরনের সরকার গঠনের জন্য দুই পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন হবে।
আরেকটি সম্ভাবনা হলো, আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে আইজেনকোটের নেতৃত্বে সরকার গঠন। কিন্তু বিরোধী জোটের ভেতরেই এ বিষয়ে মতপার্থক্য থাকায় উদ্যোগটি কতটা বাস্তবসম্মত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এ ছাড়া নেতানিয়াহু বিরোধী শিবিরের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জোটে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে বিরোধী জোটের কোনো দল বা নেতা তাঁর সঙ্গে সমঝোতায় এলে সরকার গঠনের হিসাব বদলে যেতে পারে।
আলজাজিরার বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণে নেতানিয়াহুর বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করবেন। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিষয়টিও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে নতুন নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া বা এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
টাইমস অব ইসরায়েলের তথ্য অনুযায়ী, ভোট গণনার পূর্ণাঙ্গ ফল বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রকাশ করার কথা রয়েছে। নির্বাচনের চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের সম্ভাব্য তারিখ ৪ নভেম্বর।
ফলে এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ সরকার গঠন করবে। নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোট, আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবির এবং আরব দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার ধরনই পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দর-কষাকষি, সম্ভাব্য জোট পরিবর্তন এবং সংখ্যালঘু সরকারের বিকল্প—সবকিছুই এখন আলোচনায় রয়েছে।
ভোটের ফলাফল চূড়ান্ত হওয়ার পরও সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন হতে পারে। তাই ইসরায়েলের নির্বাচনের পরবর্তী অধ্যায় নির্ভর করছে শুধু আসনসংখ্যার ওপর নয়, বরং কোন দল কার সঙ্গে কাজ করতে রাজি হয় এবং আরব দলগুলো শেষ পর্যন্ত কী অবস্থান নেয়, তার ওপরও।
পড়ুন:ইসরায়েলে নজর এখন ৫ লাখ বিশেষ ব্যালটে, কারা দিয়েছেন এসব ভোট?
ইমি/


