সীমান্তের ওপার থেকে রাতের আঁধারকে ঢাল করে চলছিল গবাদিপশু পাচারের তৎপরতা। চারপাশ যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখনই মেঠোপথ ধরে বাংলাদেশে প্রবেশ করানো হচ্ছিল ভারতীয় গরুর একটি চালান। চোরাকারবারিদের সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায় দুর্গাপুর থানা পুলিশের কৌশলী ও তাৎক্ষণিক অভিযানে। নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার ভরতপুর সীমান্ত এলাকা থেকে অবৈধভাবে আনা ১২টি ভারতীয় ষাঁড় বাছুর জব্দ করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে হাতেনাতে আটক করা হয়েছে দুজন চোরাকারবারিকে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ভোররাতে উপজেলার ২নং দুর্গাপুর ইউনিয়নের ভরতপুর সীমান্ত এলাকায় এ অভিযান পরিচালিত হয়। দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল সফল এই অভিযান সম্পন্ন করে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গভীর রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ জানতে পারেন, ভরতপুর সীমান্ত দিয়ে চোরাই পথে ভারত থেকে গরুর চালান দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করানো হচ্ছে। খবর পাওয়া মাত্রই কালবিলম্ব না করে ওসি কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। চোরাকারবারিরা যেন পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য মোটরসাইকেলযোগে পুলিশের একটি ‘অ্যাডভান্স টিম’ (অগ্রবর্তী দল) দ্রুত ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়।
অগ্রবর্তী দলটি সীমান্ত এলাকার অন্ধকার মেঠোপথে অবস্থান নিয়ে চোরাকারবারিদের গতিরোধ করে এবং গরুর চালানটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। ঠিক তার পেছনেই সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও পিকআপ ভ্যান নিয়ে ওসি খন্দকার শাকের আহমেদের নেতৃত্বে মূল আভিযানিক দলটি ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
ঘন অন্ধকার ও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের মধ্যে টর্চলাইটের আলো ফেলে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বাঁশঝাড় ও গাছপালা ঘেরা সরু মাটির পথ এবং কাঠের সাঁকো পার করে গরুগুলোকে নিরাপদে মূল সড়কে নিয়ে আসেন পুলিশ সদস্যরা। দীর্ঘ পথ হাঁটিয়ে আনার পর দেখা যায়, পাচারকারীদের নির্দয় আচরণে অবলা প্রাণীগুলোর শরীরে বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং গরুগুলো বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
এ সময় ওসি খন্দকার শাকের আহমেদকে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পরম যত্নে গরুগুলোর গায়ে হাত বুলিয়ে শান্ত করতে এবং নিরাপদে পিকআপ ভ্যানে তোলার তদারকি করতে দেখা যায়। পরবর্তীতে জব্দকৃত গরুগুলো আলামত হিসেবে দুর্গাপুর থানায় নিয়ে আসা হয়।
পুলিশ জানায়, উদ্ধারকৃত ১২টি ভারতীয় ষাঁড় বাছুরের আনুমানিক বাজারমূল্য চার লাখ ৮০ হাজার টাকা। এ সময় চোরাচালানের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন- নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার জিগাতলা এলাকার আব্দুল মান্নানের ছেলে আব্দুর রহমান (৪০) এবং একই এলাকার মৃত আবুল কাশেমের ছেলে মো. রুবেল (২৫)।
অভিযান প্রসঙ্গে দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, “গভীর রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা জানতে পারি সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে গরু আনা হচ্ছে। তাৎক্ষণিকভাবে মোটরসাইকেলে আমাদের অ্যাডভান্স টিম পাঠিয়ে তাদের ঘিরে ফেলা হয় এবং পরে আমরা গিয়ে ১২টি গরুসহ দুজনকে আটক করি। সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে যেকোনো পণ্য ও গবাদিপশু আনা-নেওয়া রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বদা তৎপর রয়েছে।”
তিনি আরও দৃঢ়তার সাথে বলেন, “মাদক, চোরাচালান ও কিশোর গ্যাং নির্মূলে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। এসব অপরাধে জড়িত কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। দুর্গাপুর উপজেলার প্রতিটি অঞ্চলে অপরাধ দমনে আমাদের পুলিশি অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
এদিকে, সীমান্তবর্তী দুর্গাপুরে ভারত থেকে অবৈধভাবে গরু চোরাচালান প্রতিরোধে পুলিশের তড়িৎ ও সাহসী অভিযানকে অত্যন্ত ইতিবাচক এবং গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সচেতন মহল। এলাকাবাসীর মতে, সীমান্ত অঞ্চলে চোরাচালান সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমাতে হলে এ ধরনের নিয়মিত নজরদারি এবং ঝটিকা অভিযান অব্যাহত রাখা জরুরি।
পড়ুন : পাবনার মালঞ্চিতে বজ্রপাতে শিশুসহ ৬ জনের মৃত্যু


