নেত্রকোনায় এইচএসসিতে পাসের হার ৪৩.৯১%, ৫ কলেজে পাস করেনি কেউ

উচ্চশিক্ষার দুয়ারে পা রাখার স্বপ্ন নিয়ে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় বসেছিল নেত্রকোনার তেরো হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী। পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা গেছে, আনন্দের চেয়ে হতাশার পাল্লাই ভারী। জেলা শিক্ষা অফিসারের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার সংশোধিত ফলাফলের তালিকায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। পুরো জেলায় গড় পাসের হার মাত্র ৪৩ দশমিক ৯১ শতাংশ। অর্থাৎ, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি। মেধার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাও পুরো জেলায় মাত্র ৭০টিতে সীমাবদ্ধ রয়েছে, যেখানে তিনটি উপজেলায় একজন শিক্ষার্থীও জিপিএ-৫ পায়নি এবং পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতভাগ পরীক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নেত্রকোনা জেলা শিক্ষা অফিসার জাহাঙ্গীর কবীর আহাম্মদের দেওয়া তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছর জেলার ১০টি উপজেলা থেকে ১৩ হাজার ৭২৪ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে কৃতকার্য হয়েছে ৫ হাজার ৮৪৮ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছে ৭ হাজার ৮৭৬ জন পরীক্ষার্থী।

ফলাফলের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জেলা সদর ও প্রান্তিক উপজেলাগুলোর শিক্ষার মানে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। পাসের হার এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তি- উভয় ক্ষেত্রেই নেত্রকোনা সদর উপজেলা সবার শীর্ষে অবস্থান করছে। সদর উপজেলা থেকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৪৮০ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছে ২ হাজার ৩০৬ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছে ২ হাজার ১৭৪ জন। সদরে পাসের হার ৫১ দশমিক ৬৮ শতাংশ, যা জেলার একমাত্র উপজেলা হিসেবে অর্ধেকের বেশি পাসের রেকর্ড গড়েছে। এছাড়া পুরো জেলার ৭০টি জিপিএ-৫ এর মধ্যে ৪৬টিই অর্জন করেছে সদর উপজেলার শিক্ষার্থীরা।

অন্যদিকে, পাসের হারে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কেন্দুয়া উপজেলা। এ উপজেলায় ১ হাজার ৫৮২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭৮৪ জন কৃতকার্য এবং ৭৯৮ জন অকৃতকার্য হয়েছে। কেন্দুয়ায় পাসের হার ৪৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬ জন। হাওরাঞ্চল খ্যাত খালিয়াজুরি উপজেলায় তুলনামূলক কম সংখ্যক (৪০৭ জন) পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও ১৯৯ জন পাস করায় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৪৮ দশমিক ৮৯ শতাংশে। এখানে অকৃতকার্য হয়েছে ২০৮ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ১ জন।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, জেলার বারহাট্টা, আটপাড়া ও কলমাকান্দা- এই তিনটি উপজেলা থেকে একজন শিক্ষার্থীও জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারেনি। এর মধ্যে বারহাট্টা উপজেলায় পাসের হার জেলার মধ্যে সর্বনিম্ন- মাত্র ৩০ দশমিক ২০ শতাংশ। এ উপজেলায় ৮৩৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ২৬১ জন পাস করেছে এবং ৫৭৩ জনই ফেল করেছে।

আটপাড়া উপজেলায় ৪৯১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১৫৪ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছে ৩৩৭ জন; পাসের হার মাত্র ৩১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। কলমাকান্দা উপজেলায় ৭০৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৪৮ জন কৃতকার্য ও ৪৫৬ জন অকৃতকার্য হয়েছে, যেখানে পাসের হার ৩৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

জেলা সদরের পর সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী ছিল পূর্বধলায়। এ উপজেলা থেকে ১ হাজার ৯৮৭ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৭৪২ জন পাস করেছে এবং ১ হাজার ২৪৫ জন অকৃতকার্য হয়েছে। পাসের হার ৩৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ হলেও জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে পূর্বধলা জেলায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে (১১ জন)।

দুর্গাপুর উপজেলায় ১ হাজার ৪৩২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে কৃতকার্য হয়েছে ৫২৫ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছে ৯০৭ জন। পাসের হার ৩৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ জন। মোহনগঞ্জে ১ হাজার ৬৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩৮৯ জন পাস করেছে এবং ৬৭৪ জন ফেল করেছে। পাসের হার ৩৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ জন। মদনে ৭৪৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৪০ জন কৃতকার্য এবং ৫০৪ জন অকৃতকার্য হয়েছে। এখানে পাসের হার ৩২ দশমিক ১২ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ জন শিক্ষার্থী।

এবারের ফলাফলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে ৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে, যেগুলোর কোনো শিক্ষার্থীই পাসের মুখ দেখেনি। শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানই নন-এমপিওভুক্ত। এর মধ্যে পূর্বধলা উপজেলাতেই রয়েছে ৩টি প্রতিষ্ঠান।

শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- কেন্দুয়া উপজেলার গোপালপুর মডেল কলেজ (নন-এমপিও), কলমাকান্দা উপজেলার কলমাকান্দা মহিলা কলেজ (নন-এমপিও), এবং পূর্বধলা উপজেলার খলিশাপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় (কলেজ শাখা নন-এমপিও), এম্বিশন মডেল কলেজ (নন-এমপিও) ও জোবায়দা জহুর উদ্দিন সরকার মহিলা কলেজ (নন-এমপিও)।

সচেতন মহল ও শিক্ষানুরাগীদের মতে, মফস্বল ও গ্রামীণ পর্যায়ের কলেজগুলোতে নিয়মিত পাঠদানের অভাব, নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতা এবং শিক্ষার্থীদের মৌলিক বিষয়ের ভীতি দূর করতে না পারার কারণেই ফলাফলে এমন বিপর্যয় ঘটেছে। আগামীতে শিক্ষার মানোন্নয়নে এবং পিছিয়ে পড়া উপজেলাগুলোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিবিড় তদারকি বাড়াতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পড়ুন : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় টিকটকে কমেন্ট নিয়ে দুই তরুণের হাতাহাতি থেকে সংঘর্ষ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন