একসময় যে মগড়া নদীর স্বচ্ছ জলে স্নান না করে দিন কাটত না নেত্রকোনাবাসীর, কালের বিবর্তনে দখল আর দূষণে সেই স্রোতস্বিনী আজ কেবলই স্মৃতির কঙ্কাল। প্রিয় নদীর এমন বিবর্ণ ও মুমূর্ষু রূপ দেখে অভিমানী কবি হেলাল হাফিজ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, তিনি আর নেত্রকোনায় ফিরবেন না- কারণ মগড়ার করুণ দশা তাঁকে প্রচণ্ড ব্যথিত করে। কবির সেই অভিমান ভাঙাতে এবং শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া মগড়াকে তার হারানো যৌবন ফিরিয়ে দিতে অবশেষে শুরু হয়েছে এক মহাযজ্ঞ। কাগজের গণ্ডি পেরিয়ে এবার সরাসরি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে নেত্রকোনায় অনুষ্ঠিত হলো ব্যতিক্রমী ও ফলপ্রসূ স্টেকহোল্ডার মতবিনিময় সভা।
রবিবার (১ নভেম্বর) বিকেল ৩টায় প্রায় তিন ঘন্টা ব্যাপী নেত্রকোনা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বিভাগের যৌথ আয়োজনে ‘নেত্রকোনা জেলার অন্তর্গত মগড়া নদী পুনরুজ্জীবিতকরণ প্রকল্প’-এর আওতায় অবৈধ দখল উচ্ছেদ কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
নেত্রকোনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি এবং রাজস্ব) মুন মুন জাহান লিজার প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার মুশফিকুর রহমান। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন নেত্রকোনা-২ (সদর-বারহাট্টা) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপি’র সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ারুল হক। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম, স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক ও পৌর প্রশাসক এ কে এম আব্দুল্লাহ বিন রশিদ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন, পরিবেশবাদী সংগঠন বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী অহিদুর রহমান, জেলা প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাজমুস শাহাদাৎ নাজু, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি অনিক মাহবুব চৌধুরী এবং নাগড়া নদীপাড়ের বাসিন্দা আবুল বাশার ফারাজী হাদীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ারুল হক আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “বিশ্বের খুব কম শহরেই এমন চিত্র দেখা যায়, যেখানে একটি নদী সাপের মতো পেঁচিয়ে পুরো শহরকে এত সুন্দরভাবে জড়িয়ে রেখেছে। ২০-২৫ বছর আগের মগড়ার ছবির সাথে আজকের চিত্র মেলালে আমরা নিজেরাই লজ্জিত হবো। নদী ও রাস্তাঘাট দখলের কারণে শহরে আজ তীব্র যানজট; একজন মুমূর্ষু রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়ার মতো পরিবেশও নেই।”
দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করে তিনি বলেন, “চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর বৈষম্যহীন ও সুন্দর সমাজ গড়তে হলে আমাদের ব্যক্তি স্বার্থ ত্যাগ করতে হবে। নদী রক্ষা ও খাল খনন বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। মগড়া উদ্ধারে আমরা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করব এবং এখানে কোনো দলীয় বা পেশিশক্তির প্রভাব বরদাশত করা হবে না। উদ্ধারকৃত জায়গা শতভাগ জনস্বার্থে ব্যবহৃত হবে।”
কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে সংসদ সদস্য সভাকক্ষেই সর্বসম্মতিক্রমে কয়েকটি যুগান্তকারী ঘোষণা দেন- নদীর পাড়ের প্রাচীন ঘাটগুলো কোনো লিজের আওতায় না থাকায় আগামী সাত দিনের মধ্যে পৌরসভা ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে সেগুলো দখলমুক্ত করার কাজ শুরু হবে। উচ্ছেদের আগে সিএস জরিপ এবং নদীর বর্তমান প্রবাহকে প্রাধান্য দিয়ে দ্রুত সীমানা নির্ধারণ (ডিমার্কেশন) ও পিলার বসানো হবে। কোনো বৈধ কাগজ ছাড়া নদীর সীমানার ভেতরে থাকা স্থাপনা তাৎক্ষণিক ভেঙে ফেলা হবে। আরএস বা বিআরএস জরিপের অসঙ্গতির কারণে যারা প্রকৃত অর্থেই বৈধ কাগজপত্রের মাধ্যমে জমির মালিক হয়েছেন, তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তিন-চার মাসের মধ্যে সংক্ষিপ্ত আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই শেষে তাদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিয়ে জমি অধিগ্রহণ করা হবে। কারণ, ভবিষ্যৎ প্রকল্পের আওতায় নদীর দুই পাড়ে ওয়াকওয়ে, পাঁচ-সাতটি সংযোগ সেতু এবং সরু সেতুগুলোকে দুই লেনে উন্নীত করা হবে। নদীপাড়ের বিতর্কিত জমিতে নতুন করে নামজারি (খারিজ) ও জমি ক্রয়-বিক্রয় সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হবে। এছাড়া নদীর জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও সবার সহানুভূতি ও সহযোগিতায় সুবিধাজনক স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে।
সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, “ইংল্যান্ডের টেমস কিংবা নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মতোই ভৌগোলিকভাবে অনন্য আমাদের মগড়া নদী। প্রকল্পটির মেয়াদ এক বছর পার হয়ে গেছে, হাতে আছে আর মাত্র এক বছর। তাই সবাই মিলে ‘টিমওয়ার্ক’ হিসেবে কাজ করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে আমরা মগড়াকে তার পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনব।”
পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, “বাঙালি কেবল আলোচনা করতেই ভালোবাসে- এই প্রবাদ ভেঙে আমাদের ছোট ছোট কদমে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। আজ সবার মধ্যে যে ইতিবাচক মানসিকতা দেখলাম, তা কাজটিকে অনেক দূর এগিয়ে নেবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে জেলা ও পৌর প্রশাসনকে পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে সর্বাত্মক নিরাপত্তা ও সহযোগিতা দেওয়া হবে।”
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরে জানান, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ৪৮ কোটি ৪৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে মগড়া নদীর ৪১ কিলোমিটার পুনঃখনন, সদর ও আটপাড়া উপজেলার আওতাধীন ৩০ কিলোমিটার এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, কচুরিপানা ও বর্জ্য অপসারণের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর শুরু হওয়া এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের ৩০ জুন। এটি বাস্তবায়িত হলে নদীর নাব্যতা ও বাস্তুতন্ত্র ফেরার পাশাপাশি প্রায় পাঁচ হাজার ৫৬০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে।
বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী অহিদুর রহমান গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলেন, “নেত্রকোনার ১১৫টি নদীর মধ্যে ১০০টিই আজ বিলুপ্ত। টিকে থাকা ১৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মগড়া নদীর পাড়ে ৮৩টি গ্রাম রয়েছে। শুধু এই নদীটি সচল থাকলে সেচ ও গৃহস্থালি কাজে বছরে অন্তত ২০ কোটি টাকার বিদ্যুৎ সাশ্রয় হতো। গ্রামে কোনো দখল নেই, যত দখল সব শহরেই।”
জেলা ছাত্রদলের সভাপতি অনিক মাহবুব চৌধুরী বলেন, “মুক্তারপাড়া থেকে তেরিবাজার পর্যন্ত পুরো নদীটিকে গিলে ফেলা হয়েছে এবং বাসাবাড়ির পয়ঃনিষ্কাশন লাইন নদীতে ফেলা হচ্ছে। অতীতে শুধু গরিবের বস্তি উচ্ছেদ হলেও রাঘববোয়ালদের বহুতল ভবন অক্ষত থেকেছে। এবার উচ্ছেদ অভিযান যেন প্রভাবশালীদের ‘হাইরাইজ বিল্ডিং’ থেকেই শুরু হয়।”
অন্যদিকে, নদীপাড়ের সাধারণ বাসিন্দাদের পক্ষে জেলা প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাজমুস শাহাদাৎ নাজু এবং নাগড়া এলাকার বাসিন্দা আবুল বাশার ফারাজী হাদী বলেন, বিগত ৪৭-৪৮ বছর আগে সরকারের আরএস ও বিআরএস রেকর্ড এবং নকশা দেখে, সরকারি কোষাগারে রাজস্ব দিয়ে যারা বৈধভাবে জমি কিনে বাড়ি করেছেন, তাদের যেন ঢালাওভাবে ‘অবৈধ দখলদার’ বা ‘ভূমিদস্যু’ বলে অপদস্থ করা না হয়। ২০০৯ সালের হাইকোর্টের রিট অনুযায়ী সিএস ও আরএস জরিপের সমন্বয়ে এবং ন্যায্য ক্ষতিপূরণের ভিত্তিতে উচ্ছেদ কার্যক্রমের দাবি জানান তারা। পাশাপাশি নদীর সীমানার ভেতরে নিজেদের এক ছটাক জমিও না রাখার ব্যাপারে তারা শতভাগ সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দেন।
সব সংশয়, আতঙ্ক ও দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটিয়ে ন্যায্যতা এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতে মগড়া নদী আবারও প্রাণ ফিরে পাবে, শহরের বুকজুড়ে বইবে নির্মল বাতাস- এমনটাই প্রত্যাশা সর্বস্তরের নেত্রকোনাবাসীর।
পড়ুন : তরুণদের জন্য স্টার্টআপ তহবিল নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে : রাসিক প্রশাসক


