যুক্তরাষ্ট্রে ভোট আজ, জরিপে পিছিয়ে রিপাবলিকানরা

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ হয়ে উঠেছে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়। মূল্যস্ফীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম এবং জ্বালানি ও আবাসন খরচ নিয়ে অসন্তোষের কারণে চাপে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। অন্যদিকে সর্বশেষ জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ফলে এবারের নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে রিপাবলিকানরা।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের রায় নির্ধারণ করবে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে এ নির্বাচনে প্রার্থী নন, তবে তাঁর প্রশাসনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, শুল্কনীতি এবং ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে অর্থনীতি নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, জ্বালানি, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল এবং রেস্তোরাঁয় খাবারের খরচ সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। অনেক ভোটার মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

তবে অর্থনীতির সামগ্রিক পরিসংখ্যানে কিছু ইতিবাচক চিত্রও রয়েছে। দেশটিতে বেকারত্বের হার তুলনামূলক কম, কর্মসংস্থানের পরিধি বিস্তৃত এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের কারণে শেয়ারবাজারে উত্থান দেখা গেছে। এতে অনেক বিনিয়োগকারী এবং অবসরকালীন সঞ্চয়ধারী আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন।

তারপরও মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমেনি। কয়েক বছর আগের তুলনায় মূল্যস্ফীতির হার কমলেও পণ্য ও সেবার দাম এখনো অনেক বেশি। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সব শ্রেণির মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। বিভিন্ন জরিপেও দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর থেকে অর্থনীতি নিয়ে জনমনে অসন্তোষ বেড়েছে।

নির্বাচনের আগের দিন সোমবার শেষ মুহূর্তের প্রচারে অংশ নেন ট্রাম্প ও রিপাবলিকান নেতারা। জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার আভাস তাদের জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে শেষ মুহূর্তে ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালান তাঁরা।

প্রচারের জন্য ট্রাম্প ওয়াশিংটনের লিঙ্কন মেমোরিয়াল রিফ্লেক্টিং পুল এলাকা বেছে নেন। এর আগে রোববার তিনি দাবি করেন, নির্বাচনে রিপাবলিকানরাই জয়ী হবেন। ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দলটি ক্ষমতায় এলে সাধারণ পরিবারগুলোকে আর্থিক সংকটে ফেলবে।

অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরাও বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনী প্রচার জোরদার করেন। টেক্সাসে জেমস টালারিকো এবং কানসাসে অ্যাডাম হ্যামিলটনের প্রচার সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে শেষ মুহূর্তে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চালায় দলটি।

নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডের ওপর কংগ্রেসের নজরদারি বাড়বে। গত দুই বছর রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেসে ট্রাম্প প্রশাসন তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল।

নির্বাচনের আগে প্রকাশিত বিভিন্ন জনমত জরিপে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দুই দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়েছে। যদিও জরিপের ফলাফল চূড়ান্ত নির্বাচনী ফলের নিশ্চয়তা দেয় না।

বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত চারটি আসন বাড়াতে হবে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাব কয়েকটি ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-সমর্থিত অঙ্গরাজ্যেও নির্বাচনী লড়াইকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছে।

সিনেট নির্বাচনে আলাস্কা, কানসাস, মেইন, ওহাইও, টেক্সাস ও আইওয়ার মতো অঙ্গরাজ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব জায়গায় ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতি হলে সিনেটের ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে টেক্সাস ও কানসাসে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য সাফল্য নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। তবে এসব অঙ্গরাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী অবস্থান থাকায় শেষ পর্যন্ত ফলাফল কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য তা বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। কারণ, বাজেট অনুমোদন, সরকারি ব্যয় এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রতিনিধি পরিষদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া বিভিন্ন কংগ্রেশনাল কমিটির মাধ্যমে প্রশাসনের কর্মকাণ্ড তদন্ত ও জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ পাবেন ডেমোক্র্যাটরা।

ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ, এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য বিতর্কিত বিষয়ে তদন্তের উদ্যোগও নিতে পারে দলটি। ফলে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে প্রেসিডেন্টের পরবর্তী দুই বছরের রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগের ভূমিকা। নির্বাচনের আগে ক্যালিফোর্নিয়ার প্রায় ২০ হাজার ভোটারের ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট নিয়ে আপত্তি তোলে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। এসব ভোটারের অনেকে মার্কিন নাগরিক নন বলে সন্দেহ প্রকাশ করে তাদের ব্যালট গণনা বন্ধ রাখার দাবি জানায় সংস্থাটি।

এ ঘটনায় ক্যালিফোর্নিয়া কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিচার বিভাগের বিরোধ তৈরি হয়। রাজ্যটির কর্মকর্তারা জানান, অ-মার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়া ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে ফেডারেল সরকারের দেওয়া তালিকার নির্ভুলতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাঁরা।

বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ২ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের আবেদন খারিজ করে দেয়। ফলে বিতর্কিত ব্যালটগুলো গণনার ক্ষেত্রে বাধা থাকল না। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে কেন্দ্রীয় সরকারের এমন পদক্ষেপ কয়েক দশকের প্রচলিত রীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে সমালোচনা তৈরি করেছে।

এদিকে আলাস্কায় রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সালিভানের সঙ্গে একই নামের আরেক প্রার্থীর নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়েও তদন্ত শুরু করে বিচার বিভাগ। ওই প্রার্থীর উপস্থিতি ভোটারদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়। তবে এ ঘটনায় বিচার বিভাগের পদক্ষেপ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে মিশিগানের সিনেট নির্বাচনেও নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য হেইলি স্টিভেন্স নিজের দলের প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদের পরিবর্তে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

রোববার তাঁর এ সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসার পর ডেমোক্র্যাট শিবিরে অস্বস্তি তৈরি হয়। কারণ, মিশিগান সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোর একটি। স্টিভেন্স এর আগে এল-সায়েদের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অবস্থান পরিবর্তন করে রজার্সের পক্ষে প্রচারে অংশ নেন তিনি।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্টিভেন্সের এ সিদ্ধান্ত ডেমোক্র্যাটদের অভ্যন্তরীণ বিভেদ আরও স্পষ্ট করেছে। তবে তাঁর সমর্থন রজার্সের ভোটের ব্যবধানে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা। অর্থনৈতিক অসন্তোষ, ইরান যুদ্ধ, অভিবাসননীতি এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য অগ্রগতি এবং সিনেটে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের কারণে নির্বাচনের ফলাফল শুধু কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্যই নয়, ট্রাম্পের বাকি মেয়াদের রাজনৈতিক গতিপথও নির্ধারণ করবে।

পড়ুন:ইরানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, দফায় দফায় বিস্ফোরণ

ইমি/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন