যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে মেতে উঠেছেন দেশটির জনপ্রিয় টেলিভিশন উপস্থাপকেরা। নির্বাচনের ফলাফল, ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান, নির্বাচনী প্রচারণা এবং বিভিন্ন সময়ের বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে নিজেদের অনুষ্ঠানে একের পর এক কৌতুক পরিবেশন করছেন তাঁরা। এ তালিকায় রয়েছেন জনপ্রিয় লেট-নাইট উপস্থাপক জিমি কিমেল, জিমি ফেলন, জন স্টুয়ার্ট ও সেথ মায়ার্স।
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছেন জিমি কিমেল। তাঁর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘জিমি কিমেল লাইভ’-এ ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী সাফল্য নিয়ে একক সংলাপে নানা কৌতুক করেন তিনি। নির্বাচনের ফলাফলকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘ব্লু সুনামি’ বা নীল সুনামি হিসেবে অভিহিত করেন কিমেল। একই সঙ্গে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও কটাক্ষ করেন এই উপস্থাপক। তাঁর ভাষায়, ট্রাম্প এখন অনেকটা ‘লেম ডাক’ প্রেসিডেন্টের মতো অবস্থায় রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ‘লেম ডাক’ শব্দটি সাধারণত এমন কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা প্রেসিডেন্টকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যাঁর মেয়াদ শেষের দিকে অথবা রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ কমে এসেছে। নির্বাচনে বিরোধী দলের সাফল্যের পর ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে এই শব্দের ব্যবহার দর্শকদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি করেছে।
কিমেলের কৌতুকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনাকে জনপ্রিয় সংস্কৃতি ও টেলিভিশন বিনোদনের সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করা। এবারের নির্বাচন নিয়েও তিনি সেই কৌশল অনুসরণ করেছেন। নির্বাচনের ফলাফল, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ট্রাম্পের অবস্থানকে ঘিরে তাঁর মন্তব্যগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে ট্রাম্পকে নিয়ে ব্যঙ্গ করার ক্ষেত্রে কিমেল একা নন। একই পথে হাঁটছেন আরেক জনপ্রিয় উপস্থাপক জিমি ফেলন। এনবিসির ‘দ্য টুনাইট শো স্টারিং জিমি ফেলন’ অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণা, প্রকাশ্য বক্তব্য, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং ব্যক্তিত্ব নিয়ে নিয়মিত কৌতুক পরিবেশন করে থাকেন তিনি।
ফেলনের অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ট্রাম্পের কথাবার্তা ও অঙ্গভঙ্গি অনুকরণ করে তাঁর ইমপ্রেশন তৈরি করা। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের পরিচিত আচরণকে হাস্যরসের মাধ্যমে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ফেলন বেশ জনপ্রিয়। ট্রাম্পের বক্তব্যের বিশেষ ভঙ্গি, শব্দচয়ন এবং আত্মবিশ্বাসী উপস্থাপনাকে অনুকরণ করে দর্শকদের হাসানোর চেষ্টা করেন তিনি। নির্বাচনের পর ট্রাম্পের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁর কৌতুকের জন্য নতুন উপাদান তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত নাম জন স্টুয়ার্ট। ‘দ্য ডেইলি শো’-এর উপস্থাপক হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি, ক্ষমতাসীনদের সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক বিতর্ক নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক বিশ্লেষণ করে আসছেন। শুধু কৌতুক পরিবেশন নয়, রাজনৈতিক বক্তব্যের অসংগতি ও সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরাও তাঁর অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, বক্তব্য এবং নির্বাচনী কৌশল নিয়ে স্টুয়ার্টের বিশ্লেষণ দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করে। তাঁর উপস্থাপনায় রাজনৈতিক ঘটনাগুলো যেমন হাস্যরসের মাধ্যমে উঠে আসে, তেমনি সেগুলোর পেছনের রাজনৈতিক বাস্তবতাও ব্যাখ্যা করা হয়। ফলে তাঁর অনুষ্ঠান অনেক দর্শকের কাছে রাজনৈতিক সংবাদ ও বিনোদনের একটি সমন্বিত মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত।
এদিকে, ‘লেট নাইট উইথ সেথ মায়ার্স’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক সেথ মায়ার্সও ট্রাম্পকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে নিয়মিত ব্যঙ্গ করে থাকেন। তাঁর অনুষ্ঠানের জনপ্রিয় বিভাগ ‘এ ক্লোজার লুক’ বিশেষভাবে পরিচিত। এই পর্বে সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনা, বিতর্কিত বক্তব্য এবং সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন তিনি।
মায়ার্সের উপস্থাপনার ধরন অন্যদের তুলনায় কিছুটা বিশ্লেষণধর্মী। তিনি কোনো একটি রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে তথ্য তুলে ধরেন এবং সেগুলোর অসংগতি বা পরস্পরবিরোধী বক্তব্যকে হাস্যরসের মাধ্যমে সামনে আনেন। ট্রাম্পকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক, তাঁর বিভিন্ন মন্তব্য এবং নির্বাচনী পরিস্থিতি তাই মায়ার্সের ব্যঙ্গাত্মক আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের লেট-নাইট টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় এসব অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বক্তব্য, প্রচারণার কৌশল এবং নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে হাস্যরসাত্মক আলোচনা দর্শকদের আকৃষ্ট করে। তবে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠানগুলোর কাভারেজে কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেছে।
আগের নির্বাচনগুলোর মতো এবার বড় বড় টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলোতে প্রচলিত সরাসরি নির্বাচন-রাতের বিশেষ আয়োজন খুব একটা দেখা যায়নি। এর পরিবর্তে উপস্থাপকেরা নিজেদের নিয়মিত অনুষ্ঠানের মধ্যেই নির্বাচনের ফলাফল ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। জিমি কিমেলের অনুষ্ঠানেও নির্বাচনের বিভিন্ন অগ্রগতি নিয়মিত পর্বের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এ ধরনের রাজনৈতিক ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে দর্শকদের রাজনৈতিক আগ্রহ এবং বিনোদনের চাহিদা। সরাসরি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ অনেক সময় দর্শকদের কাছে জটিল মনে হলেও কৌতুক ও ব্যঙ্গের মাধ্যমে একই বিষয় সহজভাবে তুলে ধরা সম্ভব। ফলে লেট-নাইট অনুষ্ঠানগুলো শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে জনমত ও আলোচনায়ও ভূমিকা রাখছে।
সব মিলিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য মার্কিন রাজনীতির পাশাপাশি দেশটির বিনোদনজগতেও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে কিমেল, ফেলন, স্টুয়ার্ট ও মায়ার্সের মতো উপস্থাপকদের কৌতুক প্রমাণ করছে, যুক্তরাষ্ট্রের লেট-নাইট টেলিভিশনে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ এখনো দর্শক আকর্ষণের অন্যতম প্রধান উপাদান।
পড়ুন:ইরান যুদ্ধের কারণেই নির্বাচনে হার, স্বীকার করলেন ট্রাম্প
ইমি/


