আরব দলগুলো নিয়ে নেতানিয়াহুর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান নির্বাচন কমিশনের

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর তোলা নির্বাচনী কারচুপি ও ভোট চুরির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে দেশটির নির্বাচন কমিশন। বুধবার কমিশন জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে হাজার হাজার ভোটকেন্দ্রে নিরীক্ষা চালিয়েও নির্বাচনে অনিয়মের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং নির্বাচনের ফলাফল ভোটারদের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন বলেই মনে করছে কর্তৃপক্ষ।

বিজ্ঞাপন

বিভাজনমূলক এই নির্বাচনের পর সরকার গঠনের হিসাব-নিকাশে ইসরায়েলের আরব দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর ক্ষেত্রে দলগুলোর সমর্থন নির্ণায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে তাদের বিরুদ্ধে কারচুপির অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও উসকে দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।

গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেট নির্বাচনে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ জোট এবং তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন ‘চেঞ্জ’ জোট—কেউই এককভাবে সরকার গঠনের মতো আসন পায়নি। ফলে সরকার গঠনের জন্য ছোট দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এবারের নির্বাচনে বিশেষভাবে নজর কেড়েছে আরব দলগুলোর সাফল্য। জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম নামের দুটি আরব দল নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে মোট ১৯টি আসন পেয়েছে। নির্বাচনের এই ফলাফল ইসরায়েলের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন আদায়ে দল দুটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।

তবে আরব দলগুলোর এই নির্বাচনী সাফল্য মেনে নিতে পারেননি নেতানিয়াহু। নির্বাচনের পর থেকেই তিনি তাদের বিরুদ্ধে ভোট কারচুপি ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে আসছিলেন। নির্বাচনের দিন নগদ অর্থসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনা এবং আইনপ্রণেতাদের কাতার থেকে অর্থ গ্রহণের অভিযোগের বিষয়েও ইঙ্গিত করেন তিনি। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অতীতে নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল।

নেতানিয়াহুর অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্ত করে ইসরায়েলের নির্বাচন কমিশন। বুধবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে কমিশন জানায়, অভিযোগ পাওয়ার পর দেশটির ৯ হাজার ৬৯টি ভোটকেন্দ্রে নিরীক্ষা চালানো হয়েছে। এতে নির্বাচনের ফলাফলে কোনো ধরনের কারচুপি বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কমিশনের বিবৃতিতে বলা হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে জমা দেওয়া সব অভিযোগ পর্যালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু এমন কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা নির্বাচনের স্বচ্ছতা কিংবা সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি করে। কমিশনের মতে, ঘোষিত ফলাফল ভোটারদের ইচ্ছার সঠিক প্রতিফলন।

এদিকে অভিযোগের ভিত্তিতে আরব দলগুলোর সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের উদ্যোগ নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার গভীর রাতে ইসরায়েলের অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারভ-মিয়ারা জানিয়েছেন, যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়া কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়া হবে না। এর আগে খবর প্রকাশিত হয়েছিল, দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেটের প্রধান আরব দলগুলোর কয়েকজন সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চেয়েছিলেন।

অ্যাটর্নি জেনারেলের এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি। বুধবার দেওয়া এক বিবৃতিতে দলটির নেতারা অভিযোগ করেন, অ্যাটর্নি জেনারেল তদন্তে বাধা সৃষ্টি করছেন। বিদেশি শক্তির মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কারচুপির যে অভিযোগ উঠেছে, সেটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও দাবি করে দলটি।

তবে লিকুদ পার্টির এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন নেতানিয়াহুর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট। সাবেক এই সামরিক প্রধান দলটির কর্মকাণ্ডকে গণতন্ত্রের ওপর আক্রমণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ তোলা এবং তদন্তের নামে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার চেষ্টা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক।

আইজেনকোট মধ্যপন্থী ও মধ্য-ডানপন্থী দলগুলোকে একত্র করে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান ঘটাতে চাইছেন। নির্বাচনে কোনো পক্ষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় তাঁর এই প্রচেষ্টায় আরব দলগুলোর সমর্থন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে সরকার গঠনের আলোচনায় তাদের অবস্থান এখন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

এর আগে ইরান ইস্যুতেও নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছিলেন আইজেনকোট। তাঁর আশঙ্কা, নেতানিয়াহু তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো সামরিক সংঘাতে জড়াতে পারেন। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে নেতানিয়াহু একটি জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনের সুযোগ পেতে পারেন। একই সঙ্গে নতুন নির্বাচন আয়োজনের আগে রাজনৈতিকভাবে সময়ক্ষেপণের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে নির্বাচনের পর ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। একদিকে নির্বাচনী কারচুপির অভিযোগ নিয়ে নেতানিয়াহু ও তাঁর বিরোধীদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে, অন্যদিকে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে আরব দলগুলোর গুরুত্বও বেড়েছে। নির্বাচন কমিশনের তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ না পাওয়ার ঘোষণার পর নেতানিয়াহুর অভিযোগ কতটা রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়, এখন সেটিই দেশটির রাজনীতিতে আলোচনার বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পড়ুন:ইরান যুদ্ধের কারণেই নির্বাচনে হার, স্বীকার করলেন ট্রাম্প

ইমি/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন