লিওনেল মেসির পর এবার আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন পর্তুগিজ সুপারস্টার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিরতির পর কিছুদিন গভীরভাবে ভেবেচিন্তে ৪১ বছর বয়সী এই তারকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক আবেগঘন বিবৃতির মাধ্যমে পর্তুগাল জাতীয় দল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের ঘোষণা দেন।
বিবৃতির শুরুতেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি লেখেন, “পর্তুগাল সবসময় আমার হৃদয়ে থাকবে।” দেশের মানুষের উদ্দেশে দেওয়া ওই বার্তায় রোনালদো আরও উল্লেখ করেন, “প্রিয় দেশবাসী, আমাদের জাতীয় দলের ৭ নম্বর জার্সিটি তুলে রাখার সময় এসেছে। আমি কখনোই এটাকে শুধু আমার একার মনে করিনি; তবে গত ২৩ বছর ধরে এই জার্সি পরার পরম সৌভাগ্য ও দায়িত্ব আমার ওপর ছিল।”
উল্লেখ্য, ২০০৩ সালে জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক ঘটা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পর্তুগালের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। তার নেতৃত্বেই ২০১৬ সালে ঐতিহাসিক ইউরো কাপ এবং ২০১৯ সালে উয়েফা নেশনস লিগের শিরোপা জিতেছিল পর্তুগাল। আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে সর্বাধিক গোল এবং দেশের হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার অনন্য সব রেকর্ড নিজের নামের পাশে রেখেই অবশেষে পর্তুগিজ জার্সিকে বিদায় জানালেন ফুটবলের এই কিংবদন্তি।
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো (CR7) তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে অসংখ্য দলীয় শিরোপা ও ব্যক্তিগত সম্মাননা অর্জন করেছেন। ক্যারিয়ারে ক্লাব ও পর্তুগাল জাতীয় দলের হয়ে তিনি ৩৫টি প্রধান ট্রফি জেতার পাশাপাশি ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডও নিজের করে রেখেছেন।
প্রধান ব্যক্তিগত পুরস্কার
ব্যালন ডি’অর ৫টি (২০০৮, ২০১৩, ২০১৪, ২০১৬, ২০১৭), উরোপিয়ান গোল্ডেন শু ৪টি (২০০৭-০৮, ২০১০-১১, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫), ফিফা দ্য বেস্ট মেনস প্লেয়ার ২টি (২০১৬, ২০১৭), ফিফা পুসকাস অ্যাওয়ার্ড (সেরা গোল) ১টি (২০০৯), উয়েফা বর্ষসেরা খেলোয়াড় ৩টি।
দলীয় শিরোপা (ক্লাব ও জাতীয় দল)
রোনালদো বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলোয়াড় হিসেবে ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় লিগগুলোতে আধিপত্য বিস্তার করেছেন।
পর্তুগাল (জাতীয় দল) ১টি উয়েফা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ (ইউরো ২০১৬), ১টি উয়েফা নেশনস লিগ (২০১৯)। রিয়াল মাদ্রিদ ৪টি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ, ২টি লা লিগা, ২টি কোপা দেল রে, ৩টি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ, ৩টি উয়েফা সুপার কাপ, ২টি স্প্যানিশ সুপার কাপ। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ১টি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ, ৩টি প্রিমিয়ার লিগ, ১টি এফএ কাপ, ২টি লিগ কাপ, ১টি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ। জুভেন্টাস ২টি সেরি আ (ইতালিয়ান লিগ), ১টি কোপা ইতালিয়া, ২টি ইতালিয়ান সুপার কাপ। আল নাসর ১টি আরব ক্লাব চ্যাম্পিয়নস কাপ (২০২৩)।
স্পোর্টিং সিপি ১টি পর্তুগিজ সুপার কাপ।
উল্লেখযোগ্য কিছু অল-টাইম রেকর্ড
সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা: ফুটবল ইতিহাসের অফিশিয়াল ম্যাচে ক্লাব ও দেশের হয়ে সব মিলিয়ে ৯৮৫টিরও বেশি গোল করে তিনি বিশ্বের সর্বকালের শীর্ষ গোলদাতা।
আন্তর্জাতিক ফুটবলের রাজা: পুরুষ আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোল (১৪৬+) এবং সবচেয়ে বেশি ম্যাচ (২৩৪+) খেলার বিশ্বরেকর্ড তাঁর।
চ্যাম্পিয়নস লিগের সম্রাট: উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোল (১৪০টি) এবং এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের (১৭টি) রেকর্ডও রোনালদোর দখলে।
রিয়াল মাদ্রিদের সর্বোচ্চ গোলদাতা: ক্লাবটির ইতিহাসে মাত্র ৪৩৮ ম্যাচে ৪৫১ গোল করে তিনি সর্বকালের শীর্ষ গোলদাতা।
রোনালদো ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫ সালে পর্তুগালের মাদেইরা দ্বীপের ফুঁশালের এক অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা জোসে দিনিস আভেইরো ছিলেন স্থানীয় ক্লাবের কিট ম্যান (মালির কাজও করতেন) এবং মা মারিয়া ডলোরেস ছিলেন একজন রাঁধুনি ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী। আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তার বাবা তার নাম রেখেছিলেন “রোনালদো”।
ফুটবলের পাশাপাশি রোনালদো একজন সফল ব্যবসায়ীও বটে, যার নিজস্ব ব্র্যান্ডের নাম CR7। তিনি তার দানশীলতা ও দাতব্য কাজের জন্য সুপরিচিত। বিশ্বের প্রথম সক্রিয় ফুটবলার হিসেবে বিলিয়নেয়ারদের তালিকায় স্থান পাওয়া রোনালদো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব মিলিয়ে) ১ বিলিয়নেরও বেশি ফলোয়ার নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় অ্যাথলেট।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো শুধু মাঠের ফুটবলার হিসেবেই নন, বরং খেলার মাঠের বাইরে এক বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য, সমাজসেবা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। ফোর্বসের শতকোটিপতিদের (Billionaire) তালিকায় স্থান পাওয়া রোনালদোর মোট সম্পদের পরিমাণ ১.২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
রোনালদো নিজের নামের আদ্যক্ষর ও জার্সি নম্বর মিলিয়ে ‘CR7’ ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করেছেন। এর অধীনে রয়েছে সুগন্ধি, অন্তর্বাস, জুতো এবং প্রিমিয়াম পোশাকের ফ্যাশন লাইন। বিশ্বখ্যাত পেস্তানা হোটেল গ্রুপের সঙ্গে যৌথ মালিকানায় তিনি ‘Pestana CR7’ নামের একটি বিলাসবহুল চেইন হোটেল গড়ে তুলেছেন। লিসবন, মাদ্রিদ, নিউ ইয়র্ক এবং মারাক্কেশের মতো বড় বড় শহরে এই হোটেলের শাখা রয়েছে। স্বাস্থ্য ও শরীরচর্চার প্রতি ভীষণ সচেতন রোনালদো ‘CR7 Crunch Fitness’ নামে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক জিম চেইন পরিচালনা করেন।
হেয়ার ট্রান্সপ্ল্যান্ট ক্লিনিক: চিকিৎসা খাতে বিনিয়োগ হিসেবে তিনি স্পেন ও পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশে ‘Insparya’ নামের একটি সফল হেয়ার ট্রান্সপ্ল্যান্ট ক্লিনিক চেইন পরিচালনা করছেন।
রোনালদো পৃথিবীর প্রথম ব্যক্তি যিনি ফেসবুক, এক্স (টুইটার), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউব মিলিয়ে ১০০ কোটির (১ বিলিয়ন) বেশি ফলোয়ারের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় স্পনসরড পোস্টের মাধ্যমে তিনি প্রতি বছর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার আয় করেন।
রোনালদো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চ্যারিটির (যেমন- সেভ দ্য চিলড্রেন, ইউনিসেফ এবং রেড ক্রস) শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি নিয়মিত রক্ত ও অস্থিমজ্জা (Bone marrow) দান করেন। এ কারণে তিনি শরীরে কোনো ট্যাটু করাননি। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের এবং শিশুদের চিকিৎসার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ সাহায্য করেছেন।
পড়ুন : ঢামেকে দুদকের আকস্মিক অভিযান, ক্ষুব্ধ দুদক চেয়ারম্যান
সা/


