নেত্রকোনা পৌর মহিলা দলের নবগঠিত ৩৩ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার এক দিনের ব্যবধানে তা স্থগিত করা হয়েছে। নব মনোনীত আহ্বায়ক নাজমা আলমের বিরুদ্ধে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ এবং এ-সংক্রান্ত একাধিক ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে জেলা মহিলা দল জরুরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কমিটিটি স্থগিতের ঘোষণা দেয়। তবে পুরো ঘটনাটিকে ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে নীরব নাটকীয়তা ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের সৃষ্টি হয়েছে।
গত ৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলা মহিলা দলের সভাপতি রোকসানা কানিজ চৌধুরী (পলমল) এবং সাধারণ সম্পাদক হাফিজা আক্তার তাদের স্বাক্ষরিত নাজমা আলমকে আহ্বায়ক এবং জেসমিন আক্তারকে সদস্যসচিব করে নেত্রকোনা পৌর শাখার ৩৩ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। কমিটি প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার বেশ কিছু আলোকচিত্র ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এসব ছবিতে দেখা যায়, নেত্রকোনা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ আলী খান খসরু এবং তার সহধর্মিণী ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভানেত্রী কামরুন্নেছা আশরাফ দীনাকে (বর্তমানে মৃত) ফুলেল শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন নাজমা আলম।
বিষয়টি নিয়ে দলের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীরা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। নেত্রকোনা জেলা যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি মো. রফিকুল ইসলাম তার ফেসবুক ওয়ালে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, “আওয়ামী লীগ নেত্রী এখন পৌর মহিলা দলের সভাপতি! আওয়ামী লীগের দোসরদের বিএনপিতে পুনর্বাসন করা হচ্ছে। যেমন নেত্রকোনা পৌর বিএনপি মহিলা দল।”
অন্যদিকে, নাজমা আলম সম্পর্কে লাক মিয়া তালুকদার নামের আরেকজন তার ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করেন, “বিগত ১৪ বছর চুটিয়ে আওয়ামী লীগ করেছে। তার প্রভাবে থাকতে পারেনি এলাকার মানুষ। তখন সে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু সাহেবের স্ত্রীর বডিগার্ড হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিত। সময় বদলের সাথে সাথে বিএনপি হয়ে গিয়েছে। গত ৫ই আগস্টের আগে এক দিনের জন্য যে মানুষটা বিএনপি করে নাই, আজ সে নেত্রকোনা সদর পৌর মহিলা দলের আহ্বায়ক হয়েছে। হায়রে রাজনীতি!”
তৃণমূলের এমন তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার মুখে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) জেলা মহিলা দলের সভাপতি রোকসানা কানিজ চৌধুরী (পলমল) ও সাধারণ সম্পাদক হাফিজা আক্তার স্বাক্ষরিত আরেক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে পৌর শাখার নবগঠিত আহ্বায়ক কমিটি স্থগিত ঘোষণা করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, সম্প্রতি অনুমোদিত কমিটি নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাঝে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ায় দলীয় নির্দেশনা অনুযায়ী কমিটি স্থগিত করা হলো, যা অবিলম্বে কার্যকর হবে।
এ বিষয়ে জেলা মহিলা দলের সভাপতি রোকসানা কানিজ চৌধুরীর (পলমল) মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাৎক্ষণিক ব্যস্ততার কথা জানিয়ে পরে কথা বলবেন বলে জানান।
পরে কমিটি গঠন এবং পরবর্তীতে তা স্থগিতের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক হাফিজা আক্তার জানান, বিগত ১৭ বছর তারা নিজেরাই মামলা-হামলা ও জেল-জুলুমের শিকার হয়ে ফেরারি জীবন যাপন করেছেন, যে কারণে কে কোন দলের সাথে যুক্ত ছিল তা নিখুঁতভাবে নজরে রাখা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, “নাজমা আলম বিগত কিছুদিন যাবৎ আমাদের সাথে দলীয় কর্মকাণ্ডে আসছিলেন এবং ধানের শীষের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে তার এমন অতীত বা ছবি রয়েছে, তা আমাদের জানা ছিল না। ফেসবুকে বিষয়টি সামনে আসার পর জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সাথে পরামর্শক্রমে এবং তাদের নির্দেশেই আমরা কমিটিটি স্থগিত করেছি।”
এদিকে, স্থগিত কমিটির বিষয়ে নাজমা আলমে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, বর্তমানে হৃদরোগে আক্রান্ত স্বামীকে নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে আছেন। গত ৩ নভেম্বর রাতে যখন তার হাতে কমিটির অনুমোদনপত্র তুলে দেওয়া হয়, ঠিক সেই মুহূর্তেই তার স্বামী হার্ট অ্যাটাক করেন। তখন থেকেই তিনি স্বামীকে নিয়ে হাসপাতালে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
ভাইরাল হওয়া ছবির বিষয়ে নাজমা আলম বলেন, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সেসব অনুষ্ঠানে অতিথিদের সাথে তোলা ছবিই এখন উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে কমিটি স্থগিতের বিষয়েও তিনি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন।
নাজমা আলমের দাবি, জেলা মহিলা দলের সভাপতি রোকসানা কানিজ চৌধুরী (পলমল) তাকে (নাজমা) ফোনে জানিয়েছেন, তিনি (পলমল) কমিটি স্থগিতের চিঠিতে কোনো স্বাক্ষর করেননি এবং কাউকে বরখাস্তও করেননি। সাধারণ সম্পাদক এককভাবে কীভাবে এটি করলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাজমা আলম।
নতুন কমিটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উত্তাপ এবং নেপথ্যের নানা সমীকরণ এখন নেত্রকোনার রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন এবং অনুপ্রবেশকারীদের ঠেকাতে দল শেষ পর্যন্ত কী চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষ।
পড়ুন : প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে সোনাইমুড়ীতে ছাত্রদলের আনন্দ শোভাযাত্রা


