তারকাখ্যাতির দম্ভে সাংবাদিককে হেনস্তা, পরীমণির খুঁটির জোর কোথায়: বিওজেএ

পেশাগত দায়িত্ব পালনরত একজন সাংবাদিককে প্রকাশ্যে শারীরিকভাবে হেনস্তা, অপদস্থ ও লাঞ্ছিত করার পর উল্টো তাঁর বিরুদ্ধেই যৌন হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগ তোলার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ, নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিওজেএ)।

সংগঠনটি বলেছে, তারকাখ্যাতির আড়ালে সাংবাদিকদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ এবং তাঁদের পেশাগত মর্যাদা নিয়ে ছিনিমিনি খেলার প্রবণতা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।

বিওজেএর সভাপতি জাহিদ ইকবাল এক বিবৃতিতে বলেন, পরীমণি নামের এই কথিত অভিনেত্রীর আচরণ ও কর্মকাণ্ডে শিষ্টাচার, পেশাদারত্ব এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার চরম ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। নিজেদের তারকা পরিচয়ের অহংকারে কিছু মানুষ এমনভাবে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন, যেন তাঁদের কোনো জবাবদিহি নেই, তাঁরা আইনের ঊর্ধ্বে। তাঁদের কথাবার্তা ও আচরণে যে ঔদ্ধত্য প্রকাশ পায়, তা শুধু দৃষ্টিকটু নয়, সামাজিক মূল্যবোধের জন্যও উদ্বেগজনক।

তিনি বলেন, একজন মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ‘ব্যাড টাচ’-এর অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, সত্য উদ্ঘাটিত হোক এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু অভিযোগের আড়ালে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার কিংবা একজন সাংবাদিককে সামাজিকভাবে হেয় করার অপচেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিও ফুটেজে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে শারীরিকভাবে হেনস্তা করার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। অথচ উল্টো ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধেই অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রকাশ্যে আসা ভিডিও ফুটেজে অভিযোগের সমর্থনে সুস্পষ্ট প্রমাণ দৃশ্যমান না হলেও সাংবাদিকের প্রতি অভিনেত্রীর আচরণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

একজন সাংবাদিকের গায়ে হাত দেওয়ার ঘটনা ভিডিওতে দৃশ্যমান থাকার পরও কেন উল্টো সাংবাদিককেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টা হচ্ছে, সেই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে।

জাহিদ ইকবাল বলেন, সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের একটি হাতে চারটি আঙুল না থাকার বিষয়টিও সামনে এসেছে। ঘটনার সময় তাঁর অন্য হাতে মোবাইল ফোন ছিল বলে ভিডিওতে দেখা যায়। এসব বিষয়সহ ঘটনার প্রতিটি দিক তদন্তে বিবেচনা করা জরুরি। আমরা কোনো পক্ষের প্রতি অন্ধ সমর্থন চাই না; চাই সত্যের প্রতিষ্ঠা। তবে ভিডিওতে যা দৃশ্যমান, তা উপেক্ষা করে একতরফাভাবে সাংবাদিককে অভিযুক্ত করার প্রবণতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

বিওজেএ সভাপতি আরও বলেন, বাংলা চলচ্চিত্রের বর্তমান সংকট ও দর্শকবিমুখতার পেছনে কিছু কথিত তারকার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, অশালীন আচরণ এবং নেতিবাচক প্রচারও কম দায়ী নয়। শিল্পী পরিচয়ের আড়ালে কেউ যদি সামাজিক শিষ্টাচার বিসর্জন দেন, তাহলে তাঁর জবাবদিহি থাকা উচিত। তাঁদের বিলাসবহুল জীবনযাপন, বাড়ি-গাড়ি, সম্পদের উৎস এবং কথিত পৃষ্ঠপোষকতার নেপথ্যেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রয়োজন রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কারা তাঁদের এতটা প্রশ্রয় দেন? কোন শক্তির বলে তাঁরা গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে এমন আচরণ করার সাহস পান?

তিনি আরও বলেন, অতীতে পরীমণির বাসা থেকে বিপুলসংখ্যক মদের বোতল উদ্ধারের ঘটনা দেশবাসীর নিশ্চয়ই মনে আছে। গত ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য শ্রদ্ধা নিবেদনের বিষয়টিও জনপরিসরে আলোচিত হয়েছে। কারও রাজনৈতিক অবস্থান ব্যক্তিগত বিষয় হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব খাটিয়ে আইন ও জবাবদিহি এড়ানোর সুযোগ নেই।

জাহিদ ইকবাল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের ব্যক্তিদের বেহায়াপনা ও ঔদ্ধত্যের যেন কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। নিজেদের কী মনে করেন তাঁরা? জনপ্রিয়তার সামান্য আলো পেয়েই কি অন্য মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার অধিকার অর্জিত হয়?

সাংবাদিকদের কি তাঁরা নিজেদের ইচ্ছামতো ব্যবহার করার উপকরণ মনে করেন? গণমাধ্যমকর্মীদের অপমান করে, তাঁদের গায়ে হাত তুলে আবার উল্টো অভিযোগের মাধ্যমে তাঁদের চরিত্রহননের চেষ্টা করা হলে সাংবাদিক সমাজ নীরব দর্শক হয়ে থাকবে না।

বিবৃতিতে বিওজেএ বলেছে, সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিরাপদ রাখা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্ব। কোনো তারকা, রাজনৈতিক ব্যক্তি কিংবা প্রভাবশালী মহলের সদস্যের জন্য আলাদা আইন থাকতে পারে না। সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে, কিন্তু সাংবাদিককে হেনস্তা করার অভিযোগও একই গুরুত্বে তদন্ত করতে হবে।

বিওজেএর জোরালো দাবি:

১. ঘটনার সব ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।
২. সাংবাদিকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত যৌন হয়রানির অভিযোগের সত্যতা যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে।
৩. সাংবাদিককে শারীরিকভাবে হেনস্তা ও পেশাগত কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করতে হবে।
৪. অভিযোগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. সাংবাদিকের নিরাপত্তা, সম্মান ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।

বিবৃতির শেষাংশে বিওজেএ সভাপতি বলেন, সাংবাদিকদের কলম থামিয়ে দেওয়ার, তাঁদের ভয় দেখানোর কিংবা মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসিয়ে দেওয়ার দিন শেষ। কোনো কথিত তারকার ব্যক্তিগত প্রভাব, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা ক্ষমতাধর মহলের আশ্রয় সাংবাদিক সমাজের কণ্ঠরোধ করতে পারবে না।

পরীমণি হোন কিংবা অন্য কেউ—আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিচার হবে, আর মিথ্যা অভিযোগ প্রমাণিত হলে তারও বিচার হতে হবে। সাংবাদিকের মর্যাদার প্রশ্নে বিওজেএ কোনো আপস করবে না।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পেলেন পরীমনি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন