বিজ্ঞাপন

ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে ট্রাম্পের ভূমিকা কি?

ইরান-ইসরায়েলের চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা ও অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উঠেছে নানা প্রশ্ন। ট্রাম্প প্রকাশ্যে কূটনীতির কথা বললেও, তাঁর বিবৃতিতে পাওয়া যাচ্ছে সামরিক হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত।

বিজ্ঞাপন

গতকাল বুধবার (১৮ মে) কাতারভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আল-জাজিরায় ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে একটি প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানা যায়।

আল-জাজিরার ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বৃহস্পতিবার সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেছিলেন, “আমরা কূটনৈতিক সমাধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।” কিন্তু মাত্র ১৪ ঘণ্টা পর, ইসরায়েল যখন ইরানের ওপর হামলা শুরু করে, তখন ট্রাম্প লেখেন, ইরানকে ৬০ দিনের সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল চুক্তির জন্য এবং সেই সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে।

রবিবার আবার ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েল ও ইরানকে একটি চুক্তিতে আসতে হবে, যেখানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকবেন তিনি। অথচ সোমবার জি-সেভেন সম্মেলন ছেড়ে কানাডা থেকে ফিরে আসার সময় ট্রাম্পের বার্তা ছিল অনেকটাই ভিন্ন। তিনি বলেন, “ইরান পারমাণবিক অস্ত্র পেতে পারবে না। “সবার এখনই তেহরান ছেড়ে যাওয়া উচিত!”

মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর এই পরস্পরবিরোধী বার্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। অনেকের মনেই প্রশ্ন উৎপন্ন হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র কি এই হামলায় জড়িত?

ট্রাম্প নিজে অবশ্য এর উত্তর নিয়ে আবারো সবার সামনে উপস্থিত হন। গত রবিববার রাতে তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।”

তবে আর্মস কন্ট্রোল এসোসিয়েশন এর পরিচালক কেলসি ডেভেনপোর্ট মনে করেন, ট্রাম্প কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সময় সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেন, “ইসরায়েল হয়তো কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনায় ভয় পেয়েছিল—এবং সেটি তাদের স্বার্থের পরিপন্থী মনে হয়েছে।”

স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলি আনসারি বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আক্রমণে না থাকলেও, তারা যে ইসরায়েলের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানত তা অনেকটাই নিশ্চিত। তাঁর ভাষায়, “সময়ের দিক থেকে বিস্মিত হতে পারে, কিন্তু ইসরায়েল যে হামলা করবে, তা তারা জানত, এটা এক ধরনের ‘উইংক’ বা সম্মতিসূচক ইঙ্গিত।”

এদিকে, ট্রাম্পের এই অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতিতে সম্ভাব্য বড় মোড় হিসেবেও দেখছেন অনেকে।

ইসরায়েলের হামলায় ইরানের নাতানজ পারমাণবিক স্থাপনার উপরের অংশ ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলো। ওই কেন্দ্রে ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন করা হচ্ছিল। পরমাণু অস্ত্র তৈরির জন্য দরকার ৯০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা IAEA বলছে, হামলার ফলে সম্ভবত ভূগর্ভস্থ অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তবে ফরদো নামের আরও একটি গোপন পারমাণবিক স্থাপনা, যা পাহাড়ের ভেতরে অবস্থিত, তা রয়ে গেছে অক্ষত। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় হামলার জন্য ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর’ নামের ৩০,০০০ পাউন্ড ওজনের বোমাটি ইসরায়েলের হাতে নেই।

সেই পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সংখ্যক রিফুয়েলিং এয়ারক্রাফট মোতায়েন করেছে। পাঠিয়েছে ইউএসএস নিমিটজ বিমানবাহী রণতরী। ঘোষণা করেছে আরও যুদ্ধবিমান পাঠানোর।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিচার্ড নেফিউ বলেন, ট্রাম্প সবসময় বিজয়ীদের পক্ষে থাকতে চান। ইসরায়েলকে তিনি এখন বিজয়ী ভাবছেন, তাই হয়তো তার অবস্থান এমন। আনসারির মতে, ট্রাম্প এই পরিস্থিতিতে নিজেকে “গৌরব ভাগীদার” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইতে পারেন। তবে একইসঙ্গে তিনি মনে করেন, এই হুমকি ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে পারে।

এদিকে মার্কিন সেনেটর টিম কেইন কংগ্রেসে একটি ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজুলেশন’ উত্থাপন করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ নিতে কংগ্রেসের অনুমোদন আবশ্যক। তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে নয়, এমন কোনো যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত নয়।”

২০১৫ সালে ওবামার আমলে সাক্ষরিত JCPOA চুক্তির মাধ্যমে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্প ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে সরিয়ে নেন। এরপর ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বাড়াতে থাকে। ২০২৩ সালে ফরদো স্থাপনায় পাওয়া গেছে ৮৩.৭ শতাংশ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম।

রিচার্ড নেফিউ বলেন, “চুক্তি বাতিল করাই আজকের সংকটের ভিত্তি তৈরি করেছে। সামরিক পথ বেছে নিলে অন্যান্য দেশও মনে করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদেরও হয়তো পারমাণবিক অস্ত্র দরকার।”

ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই গভীর হচ্ছে। কূটনীতি না কি সামরিক শক্তি? মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই দোদুল্যমান অবস্থান বিশ্বকে আরও বড় সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এখন দেখার, হোয়াইট হাউজ আবার কোন পথে হাঁটে।

এনএ/

দেখুন: ইরান-ইসরাইল নিয়ে কি কথা হলো ট্রাম্প-পুতিনের?

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন