ইরান-ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান সংঘাত যখন দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে, তখনই ইরানে বড় আকারের সামরিক অভিযান চালালো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের তিনটি পারমাণবিক কেন্দ্রে এই হামলার মাধ্যমে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে সরাসরি প্রবেশ করলো আমেরিকা।
মার্কিন হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের তিনটি মূল কেন্দ্র ফোর্দো, নাতাঞ্জ এবং ইস্পাহান। প্রতিটি কেন্দ্রই ইরানের পরমাণু কর্মসূচির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল।
অতীতে এই কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে ইসরায়েল একাধিকবার সাইবার ও সামরিক হামলা চালিয়েছে। তবে এবার প্রথমবারের মতো এগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিকভাবে আঘাত হানল। যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার পর একটি প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খেতেই পারে যে কি ছিলো এই তিন পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে? কেনই বা ইসরায়েল, আমেরিকার নজর এগুলোর ওপর? আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম সিএনএন এর এক প্রতিবেদনে পাওয়া গেছে এসব প্রশ্নের উত্তর।
যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলায় প্রথমেই যেই নামটি আসে সেটি হলো ফোর্দো। এটি ইরানের সবচেয়ে গোপন এবং সুসুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর একটি। কওম শহরের কাছে পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত এই কেন্দ্র সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য অনেকটাই অজানা।
ইসরায়েলের গোপনচর বাহিনী কয়েক বছর আগে যেসব গোপন নথি সংগ্রহ করে, সেখান থেকেই মূলত ফোর্দো সম্পর্কে জানা যায়। এই স্থাপনার মূল কক্ষগুলো মাটির ৮০ থেকে ৯০ মিটার গভীরে অবস্থিত, যা বিমান হামলার জন্য অত্যন্ত কঠিন লক্ষ্যবস্তু।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা আইএসআইএসের মতে, এই কেন্দ্রে মাত্র তিন সপ্তাহেই ৬০ শতাংশ ইউরেনিয়ামকে ২৩৩ কেজি অস্ত্র-মানের ইউরেনিয়ামে রূপান্তর করা সম্ভব। এ পরিমাণ ইউরেনিয়াম দিয়ে নয়টি পরমাণু বোমা তৈরি করা যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, বর্তমানে ফোর্দো স্থাপনায় প্রায় ২ হাজার ৭০০ সেন্ট্রিফিউজ সক্রিয় রয়েছে। এই পরিমাণ প্রযুক্তি ও সক্ষমতা ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথে অনেকটাই এগিয়ে দেয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
হামলার পরে ট্রাম্প দাবি করেছিলো এটি পুরো ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে তারা। তবে ইরান জানায়, হামলার আগেই তারা খালি করে ফেলেছিলো ফোর্দো।
দ্বিতীয় যে কেন্দ্রটিতে হামলা হয়েছে, সেটি হলো নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্র। এটি ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মূল কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের তথ্যমতে, এখানে ছয়টি ভূ-উপরিস্থ ভবনের পাশাপাশি তিনটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি স্থাপনায় একসঙ্গে ৫০ হাজার সেন্ট্রিফিউজ বসানোর সক্ষমতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, এই কেন্দ্রে ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছিল।
সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্র এবং পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নাতাঞ্জের পাইলট ফুয়েল এনরিচমেন্ট প্ল্যান্টের উপরিভাগ ধ্বংস হয়ে গেছে। ইসরায়েলের আগের হামলায়ও এই কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ক্ষতি করা হয়েছিল। কারণ ভূগর্ভস্থ হওয়ায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করাটাই ছিল কার্যকর হামলার অন্যতম কৌশল।
তৃতীয় কেন্দ্রটি হলো ইস্পাহান, যা ইরানের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত। এটিকে ইরানের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক গবেষণা কমপ্লেক্স হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভ জানায়, এই স্থাপনা চীনের সহায়তায় নির্মিত হয় এবং ১৯৮৪ সালে চালু হয়।
ইস্পাহানে প্রায় তিন হাজার বিজ্ঞানী কাজ করেন এবং এখানেই পারমাণবিক গবেষণার প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে। চীনের সরবরাহ করা তিনটি ছোট গবেষণা রিঅ্যাক্টর এখানে চালু রয়েছে। রয়েছে একটি কনভার্সন ফ্যাসিলিটি, একটি জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্র এবং একটি জিরকোনিয়াম ক্ল্যাডিং কারখানা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তিনটি কেন্দ্রই ইরানের পরমাণু কর্মসূচির মেরুদণ্ড। যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা এই মূল স্তম্ভগুলোকে বড় রকমের ধাক্কা দিয়েছে। তবে এর ফলে পুরো অঞ্চলজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
ইরান এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছে এবং জানিয়েছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি থামবে না। ইরানের পারমাণবিক সংস্থা জানিয়েছে, বিজ্ঞানীরা তাদের কাজ চালিয়ে যাবেন এবং জাতীয় স্বার্থে কোনও বাধা তারা মেনে নেবেন না।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ ধরনের হামলা শুধু পরমাণু কর্মসূচির ক্ষতি নয়, বরং আঞ্চলিক যুদ্ধের বিস্তার ঘটাতে পারে। ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সম্পৃক্ততা এই উত্তেজনার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। শান্তি ফিরবে, না কি সংঘাত আরও গভীর হবে তা নির্ধারণ করবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির আগামী সিদ্ধান্তগুলো।
এনএ/


