আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা আইএইএ’র সঙ্গে সবধরনের সহযোগিতা স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। তেহরানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রস্তাব পাশ করায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান। ইরানের সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য।
গত ২৫ জুন ইরানের পার্লামেন্ট মাজলিস আইএইএ’র সঙ্গে সহযোগিতা স্থগিতের একটি বিল পাস করে। পার্লামেন্টের প্রেসিডিয়াম সদস্য আলিরেজা সালিমি জানান, আইনপ্রণেতারা বিলটির সাধারণ ও নির্দিষ্ট ধারা সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করেছেন। এই বিল অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা এবং শান্তিপূর্ণ পরমাণু কার্যক্রমের ব্যাপারে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল থেকে নিশ্চিত না করা পর্যন্ত আইএইএ’র পরিদর্শকদের আর তেহরানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না।
এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে আসলো যখন আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসির ইরানে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবও বিবেচনাধীন রয়েছে। গ্রোসি ও তার সংস্থাকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনে সহায়তার অভিযোগ এনেছে তেহরান। ইরানি সংসদ সদস্য কাওসারি দাবি করেছেন, তিনি সরাসরি দেশের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের কাছে গ্রোসি’র ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের সাথে সংস্থাটির উত্তেজনার সূচনা হয় সম্প্রতি আইএইএ বোর্ড অব গভর্নরসের একটি প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে। ওই প্রস্তাবে, দীর্ঘ ২০ বছর পর আবারও ইরানের বিরুদ্ধে পরমাণু চুক্তির শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ তোলে সংস্থাটি। এতে বলা হয়, ইরান পরমাণু নিরাপত্তা সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে। ১৯টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়, ১১টি দেশ ভোটদান থেকে বিরত থাকে এবং রাশিয়া, চীন ও বুরকিনা ফাসো এর বিরোধিতা করে।
এই বিতর্কিত প্রস্তাব তেহরানে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এরপরই ইরান ঘোষণা দেয়, তারা একটি নতুন পারমাণবিক স্থাপনা নির্মাণ করবে এবং ফোর্দো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে উন্নত প্রযুক্তির সেন্ট্রিফিউজ স্থাপন করবে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মত, এই ঘোষণাগুলো আসলে আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি এবং নিজেদের সার্বভৌমত্বের বার্তা।
ইরানের অভিযোগ, রাফায়েল গ্রোসি’র একাধিক রাজনৈতিক ও পক্ষপাতদুষ্ট রিপোর্ট ইসরায়েলি আগ্রাসনের পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। গত ১৩ জুন ইসরায়েল ইরানে একাধিক স্থানে হামলা চালায়, যাতে নিহত হন কয়েকজন পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হওয়া সত্ত্বেও গ্রোসি এই হামলার কোনো নিরপেক্ষ বা কড়া নিন্দা জানাননি।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের চালানো সর্বশেষ হামলায় ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু স্থাপনা ফোর্ডো, নাতাঞ্জ এবং ইসফাহান টার্গেট করা হয় বি-২ স্টেলথ বোমার ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে। এই আগ্রাসনের পরও চুপ থাকেন গ্রোসি। তার এই নীরবতা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে আইএইএ’র নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানসহ অন্যান্য নেতারা শুরু থেকেই পশ্চিমা চাপ ও হুমকির বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছেন। আইএইএ’র সঙ্গে সহযোগিতা স্থগিতের মাধ্যমে তিনি যেন বুঝিয়ে দিলেন, তেহরান আর কোনো বৈষম্য, পক্ষপাত কিংবা চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ মেনে নেবে না।
বিশ্ব রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে চলমান উত্তেজনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তবে সব কিছুর মধ্যে বিশ্ববাসীর প্রতি তেহরানের স্পষ্ট বার্তা হলো- নিজেদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিয়ে কোনো আপস নয়।
পড়ুন: আবার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করতে যাচ্ছে ইরান: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
এস/


