বিশ্ব নেতৃত্ব হারাতে বসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর এই স্থান দখলে আসছে চীন। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রতিবেদনেই জানানো হয় এসব তথ্য। কাতারভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট ফরেন রিলেশনস কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্যদের প্রকাশিত এক বিশ্লেষকধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের বিশ্ববিমুখ নীতি, কূটনৈতিক তৎপরতার ঘাটতি এবং একপাক্ষিক বাণিজ্যযুদ্ধের কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অবস্থান দুর্বল করে ফেলেছে। আর সেই সুযোগে বিশ্বজুড়ে দ্রুত প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে চীন।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষমতায় আসার শুরুর দিকেই যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টে কর্মী হ্রাস এবং ইউএসএআইড ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সীমিত করে দেওয়া হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সফট পাওয়ার’ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অন্যদিকে এই শূন্যতা পূরণে এগিয়ে আসে চীন। যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, প্যারিস জলবায়ু চুক্তির মতো বৈশ্বিক উদ্যোগ থেকে পিছু হটেছে যুক্তরাষ্ট্র, সেখানে চীন বিদেশি অনুদান, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়িয়েছে। ফলে বিশ্ব নেতৃত্বের ভারসাম্য এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
জরিপেও দেখা যাচ্ছে বিশ্বজনমতের প্রতিফলন। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ বলছে, বিশ্বের ২৫টি দেশের মধ্যে অন্তত ১৫টি দেশেরই চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরী হয়েছে। মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক, কেনিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ একাধিক দেশ এখন চীনকে আগের তুলনায় বেশি আস্থার জায়গায় দেখছে।
বিশ্বজুড়ে এখনও চীনকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব থাকলেও, অর্থনৈতিক দিক থেকে চীনকেই এখন শীর্ষ শক্তি মনে করছেন অনেকে। ২০২৫ সালের জরিপে দেখা গেছে, ৪১ শতাংশ মানুষ চীনকে বিশ্বের প্রধান অর্থনীতির দেশ হিসেবে দেখছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছে ৩৯ শতাংশ।
তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত মিত্রদের দিক থেকে। কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, যুক্তরাজ্যসহ ১০টি উচ্চ আয়ের দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ২০২৪ সালে ছিল ৫১ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৫ শতাংশে। বিশেষত দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো প্রধান এশিয়া-প্যাসিফিক মিত্রদের মধ্যে এই মনোভাব পরিবর্তন আরও স্পষ্ট।
এই দেশগুলোতে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ছিল গড়ে ৫৩ শতাংশ, যা ট্রাম্প ফেরার পর কমে দাঁড়িয়েছে ২২ শতাংশে। অন্যদিকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রতি আস্থা এক বছরের ব্যবধানে ১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ শতাংশে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের একতরফা বাণিজ্য যুদ্ধ এবং মিত্রদের প্রতি আক্রমণাত্মক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বব্যাপী সন্দেহ ও অনাস্থা সৃষ্টি করেছে। সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইয়ান চং জানিয়েছেন, এশিয়ার অনেক দেশ এখন চীনের সঙ্গে অংশীদারিত্বকে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ও আকর্ষণীয় বলে মনে করছে।
তিনি আরও বলেন, যদিও অনেক দেশ নিরাপত্তা ইস্যুতে চীনের প্রতি পুরোপুরি ভরসা করেনা, তবুও তারা যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে চাইছে।
বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেন, চীনকে এখন অনেকেই “বাণিজ্যের ক্ষেত্রে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার” হিসেবে দেখছে। তিনি জানান, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সিঙ্গাপুর, নিউজিল্যান্ড ও ব্রাজিলের নেতারা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চীন সফর করেছেন। এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলো চীনের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও মজবুত করছে।
যদিও কিছু দেশ চীনের নিরীক্ষণমূলক ও দমনমূলক কৌশল নিয়ে উদ্বিগ্ন, তবুও ট্রাম্প প্রশাসনের অনিরাপত্তা ও বৈচিত্র্যহীন কূটনৈতিক কৌশলের ফলে অনেকেই বিকল্প পথ খুঁজছে। আর সেই পথ ধীরে ধীরে চীনের দিকেই মোড় নিচ্ছে।
বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে নেতৃত্ব হারানোর এই প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধুই উদ্বেগের নয়, এটি বৈশ্বিক ভারসাম্যকেও আমূল বদলে দিতে পারে। অনেকের মতে, সেই পালাবদলের সূচনা, শুরু হয়ে গেছে।
পড়ুন: ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের, শুল্ক নামল ১৯ শতাংশে
এস/


