কোটা সংস্কারের আন্দোলন থেকে তীব্র গণঅভ্যুত্থানে রূপ পাওয়া জুলাই বদলে দেয় এই ভূখণ্ডের ইতিহাস। ঐতিহাসিক জুলাই আগস্টে রাষ্ট্রীয় বাহিনী আর সরকারদলীয় গুন্ডাদের অবিশ্বাস্য নৃশংসতায় বিপুল প্রাণ আর রক্তের বোঝা মাথায় নিয়ে পতন হয় শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের। শিক্ষার্থীদের ঘোষণা ছিল, রক্তিম এ জুলাইতেই হাসিনার পতন নিশ্চিত করবে তারা। যে কারণে ৩১ জুলাইয়ের পর থেকে নতুনভাবে তারিখ গণনা শুরু করতে থাকেন আন্দোলনকারীরা। সে হিসাবে পতন নিশ্চিত হওয়ার পর ফ্যাসিস্ট হাসিনার দেশ ছেড়ে পালানোর ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট ছিল ‘৩৬ জুলাই’। তথ্যমতে, ২০২৪-এর ৩ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মোড় ঘুরে যায়। এদিন ‘দ্রোহযাত্রা’ থেকে সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনের ঘোষনা আসে। ফলে কোটা সংস্কার আন্দোলন রূপ নেয় সরকার পতনের আন্দোলনে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন ঘটাতে জনসংযোগ কর্মসূচি পালন করেন ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের’ সমন্বয়করা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জও এর ব্যতিক্রম ছিলোনা। জুলাই থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের সূচনা করেন। তবে ৩ আগস্ট রাজপথ দখলে নেয় শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করে তারা। তাদের পাশাপাশি বিক্ষোভে অনেক অভিভাবককেও যোগ দিতে দেখা যায়। এ সময় মিছিল-স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো শহর। ওইদিন বিকাল ৪টার দিকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে শহরের বাতেন খাঁর মোড়ে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। কয়েক মিনিটের মধ্যে শতাধিক শিক্ষার্থী সেখানে উপস্থিত হন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয় আব্দুর রাহিম, সদস্য সচিব সাব্বির আহমেদ, ফাতিমা তুজ জোহুরা, ছাত্র অধিকার পরিষদের মোত্তাসিন বিশ্বাসসহ বেশ কয়েকজনকে সম্মুখ সারিতে দেখা যায়। ইসলামি ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীরাও ওই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। মিছিলে অংশ নেয় বিভিন্ন ইউনিটের ছাত্রদল নেতারাও। শুরু হয় বিক্ষোভ মিছিল। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে আন্দোলনকারীদের উপস্থিতি। এর পাশাপাশি যুক্ত হন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। আধাঘণ্টার ব্যবধানে জনস্রোতে রূপ নেই মিছিলটি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে তারা বিক্ষোভ মিছিল করেন। সেখান থেকে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে বিশ্বরোড মোড় ব্লক করে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন তারা। এ সময় ওই মহাসড়কে ঘণ্টাব্যাপী যান চলাচল বন্ধ ছিল।
এ সময় শিক্ষার্থীরা স্লোগান দেন- ‘শহিদের রক্ত, বৃথা যেতে দেব না’, ‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই’, ‘শেখ হাসিনার গদিতে, আগুন জ্বালাও একসাথে’, ‘রক্তের দাগ দিচ্ছে ডাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’, ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে, জাস্টিস জাস্টিস উই ওয়ান্ট জাস্টিস, দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেবো রক্ত, বুকের ভেতর অনেক ঝড়; বুক পেতেছি গুলি কর, লেগেছেরে লেগেছে রক্তে আগুন লেগেছে’-বলে স্লোগান দেন।

বিক্ষোভ মিছিলে শিক্ষার্থীরা বলেন, কোটা সংস্কারের দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলেন তারা। কিন্তু সেখানে কোনো প্রকার উস্কানি ছাড়াই হামলা চালায় ছাত্রলীগ। পরে পুলিশ তাদের আন্দোলন দমানোর জন্য গুলি চালিয়ে নির্বিচার হত্যা করে অসংখ্য সাধারণ শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে।
৪ আগস্ট যা হয়েছিল: সরকারের পদত্যাগের একদফা দাবিতে ডাকা অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে ওইদিন বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে শহরের শান্তি মোড় থেকে একটি মিছিল বের করে আন্দোলনকারীরা। শহরের বড় ইন্দারা মোড় হয়ে নিউমার্কেটের দিকে আসার পথে বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পেছন দিক থেকে মিছিলে ইটপাটকেল ছুড়ে মারে আওয়ামী লীগের কর্মীরা। এসময় আন্দোলনকারীরা তাদের ধাওয়া করে আওয়ামী লীগ অফিসে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে এবং পাশে থাকা ১২টি মোটরসাইকেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ওই সময় আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালনে সহয়তা করতে দেখা যায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা পৌরসভার কাউন্সিলর তোহরুল ইসলাম সোহেল ও সাবেক ছাত্রদল নেতা হাসিবুল ইসলাম হাদিকে। আন্দোলনকারী ছাত্রজনতাকে উৎসাহ এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজরদারি করেন তারা।
এদিকে সংহতি প্রকাশ করে মিছিলে যোগ দেন আইনজীবীরাও। ওই মিছিলে বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম টিপু, নুরুল ইসলাম সেন্টু, যুবদল নেতা আব্দুস সালাম, অ্যাডভোকেট আশিক ইকবাল, অ্যাডভোকেট দেলওয়ার হোসেন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা অ্যাডভোকেট মাসুদ রানা, নুরে আলম সিদ্দিকী আসাদ, আবুল কালাম আযাদসহ অনেকেই অংশ নেন।বিক্ষোভ মিছিলটি শহরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে মহানন্দা সেতুর টোলঘর এলাকা অবরোধ করে স্লোগান দেয়। আন্দোলনকারীরা স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল করে রাখে পুরো শহর। এ সময় আন্দোলনকারীরা ‘জাস্টিস জাস্টিস উই ওয়ান্ট জাস্টিস, দিয়েছি তো রক্ত, আরও দিবো রক্ত, স্বৈরাচারের গদিতে আগুন জ্বালো একসঙ্গে, জ্বালোরে জ্বালো-আগুন জ্বালো, লেগেছেরে লেগেছে-রক্তে আগুন লেগেছে,’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে দেখা যায়।
এরআগে ১ আগস্ট কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোস’ কর্মসূচি পালন উপলক্ষে শহরে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সেন্টু মার্কেটের সামনে গোলচত্ত্বরে জাতীয় সংগীত, দেয়াল লিখন, রণসংগীত, কবিতা আবৃতি ও প্রতিবাদী নৃত্যের আয়োজন করে।
২ আগস্ট বৃষ্টি উপেক্ষা করে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে শহরের বাতেন খাঁর মোড়ে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। কয়েক মিনিটের মধ্যে শতাধিক শিক্ষার্থী সেখানে উপস্থিত হন। শুরু হয় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ। স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে চারপাশ।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জে অধ্যয়নরত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। মিছিলের একপর্যায়ে শহরের বড় ইন্দারা মোড়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন তারা। কয়েক মিনিট তাদের হাতে থাকা ছাতা উল্টো করে ধরে ‘সরকার উল্টে দেওয়ার’ বার্তা দেন। এ সময় তারা রংপুরের আবু সাইদসহ সারা দেশ শিক্ষার্থী নিহতের জবাব চান। পুলিশ কয়েক জাগায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন শিক্ষার্থীরা।
পড়ুন: চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে দুই বাংলাদেশির মরদেহ উদ্ধার, বিএসএফের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ
এস/


