ক্রিকেট বা ফুটবল খেলা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের যে প্রবল আগ্রহ আর আবেগ দেখা যায়, অন্য কোনো খেলা নিয়ে অতটা দেখা যায় না বললেই চলে। তাই হয়ত পত্রপত্রিকা কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় এই দুই খেলা বাদে বাকি খেলাগুলো যথেষ্ট অবহেলিত। অথচ নব্বই-এর দশকেও প্রায় সব পাড়া মহল্লায় অনেক বুদ্ধিদীপ্ত মানুষদের দেখা যেত দাবা খেলতে।
তবে বর্তমান সময়ে দাবা খেলার ব্যাপারে বেশিরভাগ মানুষের আগ্রহের জায়গা কম। সেই জায়গায় চলে এসেছে স্মার্টফোনে লুডু খেলা কিংবা অন্য কোনো মোবাইল গেম।

অথচ দাবা এমন একটি খেলা, যা কেবল বিনোদনই নয়—এটি মানুষের চিন্তাশক্তি, ধৈর্য এবং কৌশলগত দক্ষতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা যদি দাবার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে তা তাদের মননশীল বিকাশে তা খুবই সহায়ক হতে পারে।
অনেকেই হয়ত জানেন না যে বাংলাদেশের উঠতি বয়সী দাবাড়ুরা আন্তর্জাতিক অঙ্গন কাঁপিয়ে দিচ্ছে। তারা আন্তর্জাতিক অনেক পদক জিতে দেশের নাম উজ্জ্বল করছে। তবে দুর্ভাগ্যজনক সত্য হচ্ছে, তারা সাফল্য পেলেও তাদের নিয়ে তেমন প্রচারণা হয় না। হয়ত গণমাধ্যমে এক দুইবার খবর প্রকাশিত হয়, এরপর আবার তাদের সাফল্যের কথা চাপা পড়ে যায় অন্যান্য খেলার আড়ালে। ফলে এই অর্জনগুলো অনেকটা আড়ালেই থেকে যায়, যা নতুন প্রজন্মকে এই খেলায় আগ্রহী করতে বিশেষ কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না।
২০২৫ সালের নভেম্বরে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে কমনওয়েলথভুক্ত দেশ সমূহের দাবারুদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের তরুণ দাবাড়ু তাশরিক সাইহান শান দারুণ সাফল্য দেখিয়েছেন। ওপেন বিভাগের অনূর্ধ্ব-২০ ক্যাটাগরিতে তিনি রৌপ্য পদক অর্জন করেন।

প্রতিযোগিতার নবম ও শেষ রাউন্ডে ভারতের গ্র্যান্ডমাস্টার শ্যাম নিখিল-কে পরাজিত করে তাশরিক এই সাফল্য নিশ্চিত করেন। নয়টি ম্যাচে ছয় পয়েন্ট সংগ্রহ করে তিনি শুরু থেকেই শীর্ষস্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে অবস্থান ধরে রাখেন এবং শক্তিশালী পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে অনূর্ধ্ব-২০ বিভাগে রৌপ্য পদক অর্জন করেন।
কমনওয়েলথ দাবা চ্যাম্পিয়নশিপের মত বড় আন্তর্জাতিক আসরে তাশরিকের এই সাফল্য নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের দাবার জন্য একটি বড় অর্জন। তবে এই টুর্নামেন্টে আরও বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি দাবাড়ুও অংশ নিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৮ বিভাগে ওমেন ক্যান্ডিডেট মাস্টার ওমনিয়া বিনতে ইউসুফ লুবাবা ৯ খেলায় ৬ পয়েন্ট পেয়ে ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেন। মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১০ বিভাগে ওয়ারিসা হায়দার ৬ পয়েন্ট নিয়ে চতুর্থ, ওপেন অনূর্ধ্ব-১০ বিভাগে রায়ান রশিদ মুগ্ধ ৬ পয়েন্ট নিয়ে পঞ্চম, ওপেন অনূর্ধ্ব-৮ বিভাগে আজান মাহমুদ ৫.৫ পয়েন্ট নিয়ে ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেন।
এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের শিশু, কিশোর ও তরুণ দাবাড়ুরা যে সম্ভাবনার পরিচয় দিয়েছে, তা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এখন প্রয়োজন তাদের এই সাফল্যগুলোকে আরও বেশি করে সামনে আনা এবং দাবাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে এই খেলা দেশের মেধাবী প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে।
সরকার কর্তৃক যথাযথ স্বীকৃতি, সম্মাননা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই উদীয়মান দাবাড়ুরা আরও বেশি পদক জয় করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের লাল-সবুজ পতাকা উঁচিয়ে ধরবে – এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
পড়ুন : সাবেক অধিনায়কদের হাতে তুলে দেয়া হলো ‘ক্যাপ্টেন্স কার্ড’


