ঠাকুরগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে দুই দিনব্যাপী এক ব্যতিক্রমী চড়ক মেলা, যেখানে নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে গ্রাম বাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য। সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত ফারাবাড়ি গ্রামের শিব মন্দির এলাকায় আয়োজিত এই মেলায় হাজারো দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
সোমবার (২৭ এপ্রিল ) বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, নববর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত এই চড়ক পূজা ও হস্তকারুশিল্প প্রদর্শনী মেলার মূল আকর্ষণ ছিল স্থানীয় গ্রামীণ শিল্পীদের হাতে তৈরি নান্দনিক শিল্পকর্ম। কাগজ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে হাতি, হেলিকপ্টার, নৌকা, পালকি, গরু, জিরাফ, মাছসহ নানা জীবজন্তু ও যানবাহনের প্রতিরূপ।
শুধু প্রদর্শনী নয়—এসব শিল্পকর্ম মানুষ নিজ হাতে চালিয়ে মেলায় উপস্থাপন করেন, যা মেলায় এনে দিয়েছে ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা। সোমবার (২৭ এপ্রিল ) বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয় এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন।
শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী নারী-পুরুষ দলে দলে ভিড় করেন ফারাবাড়ি এলাকার শিব মন্দির মেলায়। হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা পরিণত হয় উৎসবমুখর জনসমুদ্রে।
দর্শনার্থীরা জানান, এমন ব্যতিক্রমী ও বৈচিত্র্যময় মেলা সচরাচর দেখা যায় না।
ঠাকুরগাঁও জেলা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের আহবায়ক ও জেলা বিএনপির সদস্য মির জাহিদ বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি চড়ক পূজার এই মেলা। অনেক দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসে। কাগজ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি বিভিন্ন গাড়ি ও জীবজন্তু দেখতে মানুষ ভিড় করে—পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়।”
আকচা ইউনিয়ন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নূর আলম সিদ্দিকী বলেন,“এই মেলাটি আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি বড় অংশ। এমন ধর্মীয় আয়োজনে আমরা সহযোগিতা করে আসছি ও আগামীতে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয় প্রিয়াঙ্কা রায় বলেন,“এটি সত্যিই একটি ব্যতিক্রমধর্মী মেলা। মানুষের হাতে তৈরি কাগজ ও বাঁশের বিভিন্ন যন্ত্র ও শিল্পকর্ম দেখে মুগ্ধ হয়েছি।”
আকচা ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য রোইনি বালা, , বলেন, “এ ধরনের মেলা আমাদের ঐতিহ্যকে ধরে রাখে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
শিক্ষার্থী মানষ চন্দ্র বলেন, “এখানে এত মানুষের সমাগম আর কাগজ-বাঁশের হস্তশিল্প দেখে আমি অভিভূত ও আনন্দিত।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য সন্তোষ রায় বালু বলেন, “এটি শুধু একটি মেলা নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি।”
বীরগঞ্জ উপজেলা থেকে আগত সুবর্ণ রায় বলেন, “আমি আগে কখনো এমন মেলা দেখিনি। এটি আমার জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা—দারুণ লেগেছে। আমরা চাই এমন আয়োজন প্রতি বছর করা হোক।”
অন্যান্য দর্শনার্থীরাও জানান, এমন আয়োজন প্রতিবছর হলে ভালো হয়।
মেলা কমিটির সভাপতি বাবু চন্দ্র বর্মণ বলেন, “বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বৈশাখ মাসে ৩ থেকে ৫ বছর পরপর এই চড়ক পূজা ও হস্তকারুশিল্প মেলার আয়োজন করা হয়। এবার অনুষ্ঠিত হলো ১০৫তম আসর। আমাদের মূল লক্ষ্য—গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং মানুষের জন্য বিনোদনের সুযোগ তৈরি করা।”
মেলা কমিটির উপদেষ্টা প্রদিপ কুমার রায় জানান, “বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও শান্তিপূর্ণভাবে মেলা সম্পন্ন হয়েছে। তবে এ ধরনের বড় আয়োজন করতে ব্যয় অনেক বেশি। ভবিষ্যতে এলাকাবাসীর পক্ষে এটি চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। তাই এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।”
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

