চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নার্স ও মিডওয়াইফদের একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রসূতি রোগীদের প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের মাতৃসেবা কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং কমিশনের বিনিময়ে ক্লিনিকে রেফার করার তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সিনিয়র স্টাফ নার্স অর্পিতা দত্ত, নূর নাহার বেগম, ফুলকিতা দত্ত এবং মিডওয়াইফ আফরিন, শরিফা জেসমিন ও রূমা নন্দীসহ আরও কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের প্রসূতি সেবা কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। অভিযোগ রয়েছে, অর্পিতা দত্ত, নূর নাহার বেগম ও ফুলকিতা দত্ত পুরো কার্যক্রম সমন্বয় করেন এবং অন্যদের মাধ্যমে রোগীদের নিয়ন্ত্রণে নেন।
রোগী নিয়ন্ত্রণ ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ:
হাসপাতালে আসা গর্ভবতী রোগীদের নিজেদের তত্ত্বাবধানে নিয়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা ফি নিয়ে চেকআপ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। গর্ভাবস্থায় সীমিত কয়েকটি চেকআপ করানো হলেও বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠানো হয়। এসব পরীক্ষা থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পরবর্তীতে ডেলিভারির সময় ঘনিয়ে এলে রোগীদের নানা অজুহাতে পাশ্ববর্তী প্রাইভেট ক্লিনিকে রেফার করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের কর্ণফুলী ভবনের নিচতলায় অর্পিতা দত্ত এবং খাজা টাওয়ারের তৃতীয় তলায় নূর নাহার বেগম পৃথকভাবে রোগী দেখতেন এবং হাসপাতালের রোগীদের কাছ থেকে অর্থ নিতেন। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, তাদের মধ্যে কয়েকজনের বেনামে প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে শেয়ার থাকার বিষয়েও অভিযোগ রয়েছে।
দীর্ঘ অনুসন্ধানে কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘটনার তথ্যও উঠে এসেছে। চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি ২৬ বছর বয়সী আখি আক্তার নামের এক ডেলিভারি রোগীকে নূর নাহার বেগম প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠান। সেখানে তাকে একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয়। এর আগে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিভিন্ন চেকআপের নামে তাকে আরও কয়েকটি পরীক্ষা করানো হয়েছিল।
এছাড়া ২৫ মার্চ ২০ বছর বয়সী তাসমিন আক্তার নামের আরেক রোগীকেও একইভাবে একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠানো হয়। সেখানেও তাকে একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয় বলে জানা গেছে।
একই মাসের ১২ তারিখ ১৯ বছর বয়সের সামিয়া আক্তার হাসপাতালে গেলে নার্স রুমা নন্দী তাকে প্রেসক্রিপশন দিয়ে পাশ্ববর্তী একটি ল্যাবে থাকে পরিক্ষা নিরিক্ষা করার জন্য পাঠান।
চলতি বছরে ২৭ ফেব্রুয়ারী ২৪ বছর বয়সী রুপনা দাশ নামে আরেকজন রোগীকে প্রেসক্রিপশন দিয়ে পরিক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠান অর্পিতা দত্ত।
আরও একটি ঘটনায় জানা যায়, ২ এপ্রিল আমেনা নামের এক রোগীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটি বেসরকারি ল্যাবে পাঠানো হয়।
সূত্র জানায়, ২০২২ সালে একজন রোগীকে জোরপূর্বক প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠানোর ঘটনায় সিনিয়র স্টাফ নার্স নূর নাহার বেগমের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয় এবং তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে তৎকালীন সংসদ সদস্যের সুপারিশে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৩ সালে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অপারেশন থিয়েটারে অনিয়মের অভিযোগে তৎকালীন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ডাক্তার তিমির বরণ চৌধুরী ঘটনাস্থলে গিয়ে সংশ্লিষ্ট নার্সকে ওটি কক্ষ থেকে বের করে দেন বলেও জানা গেছে।
হাসপাতালের পরিসংখ্যানেও মিলছে অসঙ্গতি:
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ডেলিভারি চেকআপের জন্য আসেন ৪২৮ জন রোগী। এর মধ্যে ভর্তি হন ৫১ জন এবং ডেলিভারি হয় ৩২ জনের, যার মধ্যে ৩টি সিজারিয়ান।
ফেব্রুয়ারি মাসে ৩৩৭ জন রোগী চেকআপে আসেন। এ সময় ৩৩টি নরমাল ডেলিভারি এবং ৩টি সিজারিয়ান সম্পন্ন হয়। বাকি রোগীদের একটি বড় অংশকে প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া মার্চ মাসে ডেলিভারি রোগী চেকআপের জন্য আসেন ৩৯৯ জন; এর মধ্যে নরমাল ডেলিভারি হয় ৩২ জন এবং সিজার হয় ২ জনের।
নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো সরকারি নার্স বা মিডওয়াইফ স্বতন্ত্রভাবে প্রেসক্রিপশন লিখতে পারেন না এবং ব্যক্তিগত চেম্বার পরিচালনার অনুমোদন নেই।
বিধিমালা অনুযায়ী, শুধুমাত্র বিএমডিসি নিবন্ধিত চিকিৎসক প্রেসক্রিপশন লিখতে পারেন। নার্স বা মিডওয়াইফ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ প্রয়োগ করতে পারেন। রোগ নির্ণয় করে নিজ উদ্যোগে চিকিৎসা দেওয়া আইনবহির্ভূত এবং ব্যক্তিগত চেম্বার পরিচালনা পেশাগত আচরণবিধির পরিপন্থী।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী এসব অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট নার্স বা মিডওয়াইফদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ, বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, বদলি বা সাময়িক বরখাস্ত, চাকরি থেকে অপসারণ, নার্সিং নিবন্ধন স্থগিত বা বাতিলসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে।
এদিকে জানা গেছে, সুপারভাইজার পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে “না ভোট” জয়যুক্ত হয় এবং সুপারভাইজার পদটি প্রয়োজন নেই বলে মতামত আসে।
তবে অভিযোগ রয়েছে, এরপরও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবু তৈয়ব ক্ষমতার অপব্যবহার করে সুপারভাইজার পদে নিয়োগ দেন, যা তার এখতিয়ার বহির্ভূত বলে দাবি করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবু তৈয়বের কাছে জানতে চাইলে তিনি নার্সদের অনিয়মের বিষয়টি অকপটে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, একটি সিন্ডিকেটের কারণে হাসপাতালের সেবার মান ব্যাহত হচ্ছে। ডেলিভারি রোগীদের প্রাইভেট ক্লিনিকে রেফার করার বিষয়টি তিনি শুনেছেন। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে একই হাসপাতালে থাকার কারণে নার্সদের মধ্যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে ডেলিভারি বাড়ানোর জন্য একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। অন্যদিকে সুপার ভাইজার এর বিষয়ে বলেন, সবার সম্মতিক্রমে সুপার ভাইজার নিয়োগ দিয়েছি।
এই বিষয়ে ডিজিএনএম কর্তৃক নিয়োগকৃত জেলা সুপারভাইজার (পাবলিক হেলথ নার্স) নাসরিন আক্তার জানান, অভিযোগের বিষয়ে জেনে জেলা ডেপুটি সিভিল সার্জন তৌহিদুল আনোয়ার খানকে বিষয়টি অবহিত করার পর তিনি পটিয়া স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে ফোন দিয়ে বলেন, সুপারভাইজার নিয়োগের বিষয়ে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার একতেয়ার নেই। এছাড়া তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নার্সদের অনিয়মের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
সুপারভাইজার নিয়োগ ও নার্সদের অনিয়মের বিষয়ে জানতে একাধিকবার জেলা ডেপুটি সিভিল সার্জন তৌহিদুল আনোয়ার খান কে ফোন ও টেক্সট দেওয়া হলে তিনি ফোন রিসিভ ও ম্যাসেজ এর উত্তর দেননি।
এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত হওয়ার পর পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে জোরালো পদক্ষেপ নিচ্ছেন এনামুল হক এনাম এমপি। তিনি ইতোমধ্যে সংসদে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ২০০ শয্যায় রূপান্তরের জন্য প্রস্তাব দিয়েছেন। এছাড়া সম্প্রতি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন শেষে দীর্ঘদিনের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে তিনি জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, “পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না। যারা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পড়ুন:কোটিপতি পিয়ন আল্লাউদ্দিন
দেখুন:হাইডেলবার্গ: বাস্তবের চেয়েও সুন্দর?
ইমি/


