লালমনিরহাটের দিগন্তজোড়া মাঠ আর তিস্তার চরাঞ্চলে ভুট্টা ও বোরো ধানের বাম্পার ফলন দেখে কৃষকের মুখে হাসির ঝিলিক থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে চিত্রটি ভিন্ন। একদিকে উত্তরের জীবনরেখা খ্যাত তিস্তা নদী অকাল শুকিয়ে যাওয়ায় সেচ সংকট, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাবে জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বমূল্য এই দুই সংকটের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন জেলার হাজার হাজার কৃষক।
শুধু ভুট্টা ,বোরো ধান নয়, মিষ্টি কুমড়াসহ বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদও এখন খাদের কিনারায়। স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিস্তা নদীর পানি আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় চরাঞ্চলসহ নদীর তীরবর্তী জমিগুলোতে সেচ দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
তিস্তা ব্যারেজের প্রধান ক্যানেলগুলোতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় ‘কমান্ড এরিয়া’র হাজার হাজার হেক্টর জমির চাষাবাদ এখন অনিশ্চয়তার মুখে। বিকল্প উপায়ে সেচ ব্যবস্থাতেও বাধা হয়ে দাড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারে। ডিজেলের অপ্রতুলতা ও দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ভুট্টা, ধানসহ ফসলের জমিতে পানি দিতে কৃষকের খরচ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০-৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে, যা কৃষককে ব্যাপক লোকসানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিস্তার বিস্তীর্ণ বালুচরে প্রচুর পরিমাণে মিষ্টি কুমড়া, খিরা ও তরমুজের চাষ ব্যাহত হচ্ছে পানির অভাবে। এছাড়া চরাঞ্চলে উৎপাদিত চীনাবাদাম এবং বিভিন্ন গ্রীষ্মকালীন শাকসবজিও পর্যাপ্ত পানির অভাবে ফলন বিপর্যয়ের মুখে। কিছু কিছু এলাকায় আছে সারের সংকট। হাতীবান্ধা উপজেলার কৃষক মহসিন আলী বলেন, ‘নদীতে হাঁটু পানিও নাই যে সেচ দেমো। বাধ্য হয়া শ্যালো মেশিন চালাচ্ছি, কিন্তু তেলের যে দাম! আমাদের এখানে তেলের পাম্পে ভিড়, আর দামও বেশি । ২০০ টাকা লিটার চায়। পানি আর তেলের খরচ দিয়া এবার ভুট্টা আর ধান ঘরে তোলা খুব কঠিন হইবে।’
বড়খাতা এলাকার কৃষক মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এবারের মত চিন্তা আর কোনবার হয় নাই। তেল নাই, পানি নাই, সার নাই। এভাবে কী চাষ করা যায়! বউ বাচ্চা নিয়া এবার না খেয়ে থাকা লাগবে।’ এদিকে সরকারি তদারকির মাধ্যমে মজুত রাখা হয়েছে ডিজেল, আর সারের সংকট কাটিয়ে বর্তমানে পর্যাপ্ত পরিমান সার মজুদ আছে দাবি কৃষকদের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো মতিউল আলম বলতেন, ‘বর্তমান আমাদের ডিজেলের কোন ঘাটতি নেই। মধ্যাবস্থায় আছে বেশিরভাগ ফসল। প্রাকৃতিক বৃষ্টিতেই অনেকটা সেচের চাহিদা পূরণ হয়েছে। আর পর্যাপ্ত সারও মজুত আছে।’ তবে কৃষিবিদরা বলছেন, তেলের বাজার স্বাভাবিক না হলে কিংবা তিস্তায় পানির প্রবাহ না বাড়লে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলার ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।


